উত্তর কলকাতার গৌরীবাড়ির এক পুরোনো বাড়িতে দিন কাটাচ্ছেন প্রবীণ অভিনেতা ‘শঙ্কর ঘোষাল’ (Shankar Ghoshal)। বয়স এখন ৭৫ পেরিয়েছে, শরীরও আগের মতো শক্ত নেই। দীর্ঘদিন ধরে পার্কি’নসন্স রো’গে ভুগছেন তিনি, ফলে চলাফেরা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অভিনয় থেকে অনেকটাই দূরে সরে যেতে হয়েছে অসুস্থতার কারণেই। একসময় কাজ করে যে সামান্য সঞ্চয় করেছিলেন, চিকিৎসা আর সংসারের খরচে তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এখন মাসে অল্প কিছু টাকার সাহায্য আসে তাঁর অভিনেত্রী বোন রত্না ঘোষালের কাছ থেকে।
সেই টাকাতেই কোনওভাবে স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। এই আর্থিক সংকটের মাঝেই সম্প্রতি সামনে এসেছে তাঁর আরও এক অভিযোগ। তিনি দাবি করেছেন, নিজের পরিবারেই নাকি তিনি মা’নসিক এবং শা’রীরিক অশান্তির মুখোমুখি হচ্ছেন। তাঁর কথায়, ছেলে ও বৌমার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ চলছে আর সেই টানাপোড়েনই কখনও কখনও উত্তপ্ত পরিস্থিতির দিকে গড়ায়। এমনও অভিযোগ করেছেন যে একবার ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়ে তাঁর পায়ে চোট লাগে এবং র’ক্তপাতও হয়।
এমনকি নাতির আচরণও তাঁকে কষ্ট দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বয়স আর অসুস্থতার কারণে প্রতিবাদ করার মতো শক্তি তাঁর আর নেই, এই কথাই তিনি আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন। তবে একই ঘটনার অন্য দিকও সামনে এসেছে। তাঁর স্ত্রী ভারতী ঘোষাল স্বামীর অভিযোগ পুরোপুরি মানতে চাননি। তাঁর দাবি, পরিবারের সমস্যাকে শঙ্কর ঘোষাল হয়তো একটু বেশি করে তুলে ধরছেন। ফলে ঘটনাটিকে ঘিরে দুই ভিন্ন মত সামনে এসেছে, আর তাই পুরো পরিস্থিতি ঠিক কী, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
তবু, একজন প্রবীণ শিল্পী নিজের বাড়িতে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন, এই কথাটাই স্বাভাবিকভাবেই অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি স্থানীয় থানার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন, যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও তদন্তের আগে নিশ্চিত কিছু বলা হয়নি। তবে, এই ঘটনার বাইরেও আরও বড় একটি প্রশ্ন উঠে আসছে, বাংলা বিনোদন জগতে বহু বছর কাজ করা শিল্পীদের ভবিষ্যৎ আসলে কতটা নিরাপদ? শঙ্কর ঘোষালের বাড়ির অবস্থা বা তাঁর আর্থিক অবস্থার কথা শুনলে সহজেই বোঝা যায়, জীবনের শেষ পর্বে তিনি কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আজকের দিনে টেলিভিশন বা সিরিয়ালের নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অল্প সময়েই আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ছেন। বাড়ি, গাড়ি, দামি জীবনযাপন সবই যেন খুব দ্রুত এসে যাচ্ছে তাঁদের জীবনে। অথচ অন্যদিকে বহু বর্ষীয়ান শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা বছরের পর বছর শিল্পকে সময় দিয়েছেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ বা ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না! এই কারণেই অনেকের মতে, শঙ্কর ঘোষালের ঘটনা যেন শিল্পী সমাজের এক গভীর বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ‘পিসির জন্য খুব খারাপ লাগে…’ মমতা শঙ্করকে নিয়ে কেন এমন মন্তব্য, ভাইঝি শ্রীনন্দা শঙ্করের? খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা, কোন মা’নসিক চাপের কথা আনলেন সামনে? কেনই বা ক্যামেরার পেছনে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন অভিনেত্রী?
একসময় পর্দায় পরিচিত মুখ ছিলেন এমন অনেক শিল্পী যেমন বাসন্তী দেবী, নিমাই ঘোষ বা শঙ্কর ঘোষালের মতো মানুষ আজ নীরবে আর্থিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছেন। বাংলা ইন্ডাস্ট্রি কি তাঁদের জন্য কোনও স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারে না? দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকে যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের জীবনের শেষ সময়ে যদি এমন অনিশ্চয়তায় কাটাতে হয়, তাহলে সেটি সত্যিই ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনার পর সেই প্রশ্নটাই আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এই বিষয়ে আপনাদের কী মতামত? জানাতে ভুলবেন না!






