“আমি কখনো নিজের আইডেন্টিটি হারাইনি!” উত্তম কুমারের পরিবারের ছোট বউ হয়েও কেন সেইভাবে নায়িকা হয়ে উঠতে পারেননি সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়? মহানায়কের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল? কেন শেষ জীবনেও তিনি অভিনয়জগত থেকে দূরে ছিলেন?

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে কিছু নামই চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম হলেন সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই নয়, তিনি ছিলেন ঘরের আদরের ছোট বউও। ভবানীপুরের গিরীশ মুখার্জী রোডের ছোট বউ হিসেবে তিনি চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সকলের প্রিয় ছিলেন। তবে তাঁর জীবনের গল্প এখানে শেষ নয়, বরং পর্দায় ও মঞ্চে তাঁর অবদানও সমানভাবে বিস্ময়কর।

সুব্রতার জন্ম ১৯৪১ সালের ১৮ জুলাই, মূল নাম সুব্রতা সেন হলেও তিনি বিয়ের পর চট্টোপাধ্যায় উপাধি গ্রহণ করেন। যুবাবস্থায় অভিনয় শুরু করে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেন। “চিড়িয়াখানা”, “সাতপাকে বাঁধা”, “প্রথম কদম ফুল”, “মেঘ”, “কালো”, “স্ত্রী”, “পিতা-পুত্র”, “মেম সাহেব” এবং “বিষবৃক্ষ” সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন। বিশেষ করে “বেহুলা লক্ষীন্দর” ছবিতে মা মনসার চরিত্রে তার অভিনয় নজর কেড়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের “চিড়িয়াখানা” ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রী পুরস্কার লাভ করেন।

অভিনয় জীবনের পাশাপাশি সুব্রতা ছিলেন পরিবারের জন্যও অত্যন্ত যত্নশীল। উত্তম কুমারের ছোট ভাই তরুণ কুমারের স্ত্রীরূপে তিনি শুধু শাশুড়ি নয়, দুই ভাসুরের সঙ্গেও গভীর স্নেহের সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ছোট বোনের মতো ভাসুরদের সন্তানদের তিনি আদর করেছিলেন। তফাৎ কোনো পার্থক্য রাখেননি তার নিজের মেয়ে মনামির সঙ্গে। এই পরিবারিক বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা তাঁকে অন্য অভিনেত্রীদের থেকে আলাদা করে।

তবে ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, সুব্রতার প্রতিভার যথাযথ মর্যাদা পাওয়া কিছুটা কঠিন ছিল। বিয়ের পরও অভিনয় চালিয়ে যাওয়া, নায়িকা হিসেবে সুযোগের সীমাবদ্ধতা—সবকিছু মিলিয়ে তিনি পর্দায় নিজস্ব স্ফুরণ বজায় রেখেছিলেন। মঞ্চের নাটক “কৃষ্ণকান্তের উইল”-এ ভ্রমরের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। এমনকি মহানায়ক উত্তম কুমারও সেই নাটক দেখতে এসে সেদিন পুরো প্রেক্ষাগৃহে বসেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ ‘ওর মতো অভিনেতাদের চিরকাল থামিয়ে রাখা যায় না!’ টলিউডে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের ‘নিষিদ্ধতা’, দীর্ঘদিন ধরে কাজ না পাওয়া এবং ফেডারেশন-পরিচালক দ্বন্দ্ব নিয়ে মুখ খুললেন চন্দন সেন! নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে, টলিউডের অন্দরের কোন কথা করলেন ফাঁস?

ব্যক্তিগত জীবন ও অভিনয়ের মিলনেই সুব্রতার সত্যিকারের মান বেরিয়েছিল। ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তিনি চলে যান পরলোকগামী। তবে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি একজন স্বতন্ত্র অভিনেত্রী এবং স্টাইল আইকন হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। জীবনে পরিবার, অভিনয়, এবং স্বতন্ত্রতা—সবকিছুর মধ্যে সুব্রতা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক অনন্য উদাহরণ।

You cannot copy content of this page