স্টুডিওপাড়ার সাম্প্রতিক অশান্তি ঘিরে এবার সরব হলেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী। বৃহস্পতিবার টলিপাড়ায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, মারপিট এবং ইঁট-ডিম ছোড়ার ঘটনায় তৈরি হওয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অভিনেত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে টেকনিশিয়ানদের দুর্দশা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান সংকটের নানা দিক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, টলিউডের এই পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। বিশেষ করে যাঁরা ক্যামেরার পিছনে থেকে দিনরাত কাজ করেন, তাঁদের উপর হামলার ঘটনা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। এই প্রসঙ্গে তিনি ইন্ডাস্ট্রির প্রকৃত কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছেন।
তাঁর বক্তব্য ইতিমধ্যেই টলিপাড়ায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সুদীপ্তার মতে, টেকনিশিয়ান ও কলাকুশলীরাই চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন জগতের আসল ভিত্তি। তাঁদের পরিশ্রম ছাড়া কোনও শিল্পী বা প্রকল্প সফল হতে পারে না। এই প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, “শিল্পী হিসাবে আজ আমি যদি কিছুমাত্র সাফল্য পেয়ে থাকি, তা তাঁদের কাঁধে ভর দিয়েই পেয়েছি। পোস্টারে আমাদের ছবি বেরোয়, মিডিয়া আমাদের সাক্ষাৎকার ছাপে, দর্শক আমাদের মাথায় তোলেন…কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ জানতেও পারেন না বা জানতে চান ও না, এত সুন্দর গল্পটা কার লেখা, এই অপূর্ব দৃশ্য ক্যামেরায় কে তুললো, এত ভালো আলো কে করলো, এই দারুণ মেকআপ বা চুল কে বাঁধলো।”

তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, সিনেমা শেষ হওয়ার পর যে ‘এন্ড টাইটেল’-এ এই সব কর্মীদের নাম ভেসে ওঠে, তা দেখার জন্য বেশিরভাগ দর্শকই অপেক্ষা করেন না। অথচ সেই মানুষগুলিই শুধু চান কাজ হোক, ভালো ছবি তৈরি হোক এবং তাঁদের পরিবার দুবেলা খাবার পায়। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, টলিপাড়ার হাজার হাজার কর্মী এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর দাবি, প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার কলাকুশলী আজ দিশাহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ২৬টি গিল্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে, ফেডারেশন থাকবে কি না, তা নিয়েও স্পষ্ট কোনও ধারণা নেই। এই পরিস্থিতির মাঝেই তিনি বহিরাগতদের উপস্থিতি নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন।
সুদীপ্তার দাবি, গত কয়েকদিন ধরে স্টুডিও চত্বরে রাজনৈতিক পতাকা হাতে এমন বহু মুখ দেখা গিয়েছে, যাঁদের তিনি আগে কখনও শুটিং ফ্লোরে দেখেননি। সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত হামলার দৃশ্য দেখার পর তাঁর প্রশ্ন। “যারা ইঁট আর ডিম ছুঁড়লো তাদের একজনকেও কস্মিনকালেও কোনো শুটিং ইউনিটে দেখিনি। এরা আমাদের টেকনিশিয়ান নয়। এরা তবে কারা? কেন অশান্তি বাধাচ্ছে?” টলিউডের বর্তমান সংকটের জন্য রাজনৈতিক প্রভাবকেই দায়ী করেছেন সুদীপ্তা। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে রাজনীতির প্রবেশ ঘটানো হয়েছে, যার ফল আজ সবাইকে ভুগতে হচ্ছে।
অভিনেত্রীর কথায়, “সরাসরি রাজনীতি ঢুকিয়ে বিগত সরকার ফিল্ম ও টিভি ইন্ডাস্ট্রির কোমর আগেই ভেঙে দিয়ে গেছে।” তিনি আরও দাবি করেন, ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষ নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন, অথচ সাধারণ শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। একের পর এক পরিচালককে ‘ব্যান’ করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে শুটিং বন্ধ হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ কর্মীরাই। তাঁদের কাজ বন্ধ হয়েছে, আয় কমেছে এবং ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন জানিয়েছেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী। প্রথমত, টেকনিশিয়ানদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনার দাবি তুলেছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ নজিরবিহীন ঘটনা! স্টুডিওপাড়ায় শিল্পীদের সঙ্গে শ্লী’লতাহানি ও তো’লাবাজির অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস! রাজনীতির পর এবার টলিপাড়ায়ও ধাক্কা ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর!
দ্বিতীয়ত, সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ফিল্ম ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির বাইরে রাখার আবেদন জানিয়েছেন। তৃতীয়ত, যাঁরা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী বা কলাকুশলী, তাঁদের স্টুডিওর ভিতরে রাজনৈতিক পরিচয় না আনার প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে টেকনিশিয়ানদের সমস্ত ন্যায্য দাবির পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। শেষদিকে অভিনেত্রী জানান, স্টুডিওপাড়ার বর্তমান অবস্থা দেখে তিনি অত্যন্ত অসহায় এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এখন নজর প্রশাসনের দিকে, কারণ তাঁর এই বিস্ফোরক বক্তব্যের পর টলিপাড়ার অচলাবস্থা কাটাতে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, সেটাই দেখার।






