বাঙালির আবেগে আজও এক নাম অমলিন, উত্তম কুমার (Uttam Kumar)। পর্দায় তাঁর রোমান্টিক উপস্থিতি, অভিনয়ের জাদু নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, ততটা কিন্তু হয়নি তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্য এক দিক নিয়ে। জীবনের নানা সময়ে তাঁকে ঘিরে বিতর্ক, গুঞ্জন, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনাসবই সামনে এসেছে। কিন্তু এই সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নিঃশব্দ মানবিক মানুষ, যার গল্প খুব কমই আলোচনায় উঠে এসেছে।
মহানায়কের স্বভাবই ছিল আলাদা। তিনি সাহায্য করতেন, কিন্তু কখনও তা প্রচার পছন্দ করতেন না। বহু কন্যাদায়গ্রস্ত বাবার পাশে দাঁড়িয়ে অর্থসাহায্য করেছেন তিনি, কিন্তু শর্ত ছিল একটাই এই কথা যেন বাইরে না যায়। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গল্প ছড়িয়ে পড়েছে লোকমুখে। কৃতজ্ঞ মানুষের মুখে মুখেই জানা গেছে, কতভাবে তিনি নিঃশব্দে মানুষের পাশে থেকেছেন।
আরও পড়ুনঃ “দেখতে দেখতে ২১ দিন…আর কবে আমরা জানতে পারব, রাহুলকে কেন চলে যেতে হলো?” এতদিনে রোগী সুস্থ হয়ে যায়, সেখানে এখনও সঠিক তদন্তের কোনও লক্ষণ নেই? অভিনেতার মৃ’ত্যুর কারণ নিয়ে, কী প্রশ্ন তুললেন রূপালি রাই ভট্টাচার্য?
এমনই এক ঘটনার কথা শোনা যায় তাঁর সহকর্মী মণি শ্রীমানির পরিবারে। মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাড় করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন মণি। সেই খবর পৌঁছয় উত্তম কুমারের কাছে। সরাসরি সাহায্য করলে তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত লাগতে পারে এই ভেবে অন্য পথ বেছে নেন মহানায়ক। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, বহু শিল্পীকে একত্রিত করে সেই অনুষ্ঠান থেকে ওঠা অর্থ দিয়ে মণির মেয়ের বিয়ের খরচের বড় অংশ সামলে দেন তিনি।
শুধু সহ-অভিনেতা নয়, সাধারণ টেকনিশিয়ানদের প্রতিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একইরকম। একবার শুটিং চলাকালীন এক লাইটম্যানের কাজে ভুল দেখে তাঁকে আলাদা করে ডেকে নেন। বকাঝকা নয়, বরং জানতে চান সমস্যার কথা। জানা যায়, মেয়ের বিয়ের খরচের চিন্তায় মনোযোগ হারিয়েছিলেন তিনি। পরের দিনই নিজের বাড়িতে ডেকে সেই লাইটম্যানের হাতে পুরো বিয়ের খরচ তুলে দেন উত্তম কুমার। কোনো প্রচার নয়, নিঃশব্দে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এটাই ছিল তাঁর স্বভাব।
এই মানবিকতা শুধু আর্থিক সাহায্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সহকর্মীদের সঙ্গে সমানভাবে থাকার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। আউটডোর শুটিংয়ে বিলাসবহুল বাংলোতে একা থাকার বদলে পুরো ইউনিটকে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করানোর জন্য জোর দেন। এমনকি ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ ছেড়ে টেকনিশিয়ানের বাড়ির বিয়েতে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে তাঁর জীবনে। আবার পাড়ার দুর্গাপুজো পুড়ে যাওয়ার পর গোপনে পুরো খরচ বহন করে নতুন করে পুজোর আয়োজন করেছিলেন তিনি।
কিন্তু নিজের নাম প্রকাশ করতে দেননি। আজও তাই প্রশ্ন ওঠে আমরা কি শুধুই পর্দার তারকাকে মনে রেখেছি, না কি সেই মানুষটিকেও মনে রেখেছি? উত্তম কুমারের এই অজানা গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর কাজেই নয়, তাঁর মানবিকতাতেও লুকিয়ে থাকে। আর সেই কারণেই হয়তো তিনি শুধু মহানায়ক নন, মানুষের হৃদয়ে চিরকালীন এক ‘মানুষ’ হিসেবেও বেঁচে আছেন।






