‘মায়ের সামনেই আমায় কু*প্রস্তাব দেয়, তারপর…’ ‘আমি অভিনয় করতে এসেছি, নিজেকে বেচতে বা অস’ভ্যতামি করতে আসিনি!’ ‘পাইনি মানেই রাজনীতির জন্য বসিয়ে রেখেছে’ এই যুক্তি মানতে নারাজ, বরং পেয়ে কাজ ফিরিয়ে দেওয়া ক্ষমতা রাখেন এমিলা ভট্টাচার্য! ছোটবেলায় ধারাবাহিকে কাজ করতে গিয়ে কী ঘটেছিল তাঁর সঙ্গে? অত্যন্ত অশা’লীন ও অপমা’নজনক সেই অভিজ্ঞতার কথা অকপটে ভাগ করলেন অভিনেত্রী?

বিনোদন জগতের ঝলমলে পর্দার আড়ালে শিল্পীদের জীবনে লুকিয়ে থাকে এমন বহু অজানা গল্প, অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও না-বলা কথা, যা সাধারণ দর্শকের কাছে কখনওই পৌঁছয় না। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে সেই অজানা অধ্যায়গুলিই প্রকাশ্যে আসে। এবার তেমনই এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়জীবন, কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, পরিবার এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন অভিনেত্রী এমিলা ভট্টাচার্য। কাজের বাইরে প্রচারের আলোয় থাকতে খুব একটা পছন্দ করেন না তিনি। বরং তাঁর কাছে অভিনয়ই মূল পরিচয়। সেই কারণেই দীর্ঘ কেরিয়ারে বহু সুযোগ হাতছাড়া হলেও নিজের নীতি ও আত্মসম্মানের সঙ্গে কখনও আপস করেননি বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগ, লবি এবং যোগ্যতার বদলে অন্য বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য উঠে এসেছে এই সাক্ষাৎকারে।

এমিলা ভট্টাচার্য বাংলা টেলিভিশন ও বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের অভিনয়জীবনে একাধিক ধারাবাহিক ও নানা ধরনের চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে। সম্প্রতি ‘সোহাগে আদরে’ ধারাবাহিকের কাজ শেষ করেছেন তিনি। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক কাজেও যুক্ত থাকেন এমিলা। নিজের করা সমাজসেবামূলক কাজের প্রচার করতেও তিনি স্বচ্ছন্দ নন। তাঁর কথায়, কারও বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তকে ছবি তুলে বা ভিডিও বানিয়ে প্রচার করা তাঁর কাছে প্রকৃত সমাজসেবা নয়। একইভাবে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য সারাক্ষণ সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকার বিষয়টিও তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেন না। তাঁর কাছে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিষয় এবং সেই সুযোগ পেলে নিজের সেরাটা দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। এমনকি একটি কাজ চলাকালীন অন্য কাজের প্রস্তাব এলেও শুধুমাত্র বেশি সুযোগ বা অর্থের আশায় চলতি কাজকে সমস্যায় ফেলতে চান না তিনি।

তাঁর মতে, কথা দেওয়ার মূল্য রয়েছে এবং পেশাদারিত্ব মানে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করা, নিজের দায়িত্ব পালন করা এবং প্রযোজকের অর্থ ও সময়ের প্রতিও সম্মান দেখানো। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাওয়া নিয়ে যে অভিযোগ বহু শিল্পীর মুখে শোনা যায়, সেই প্রসঙ্গেও অত্যন্ত স্পষ্ট মত দিয়েছেন এমিলা। অনেকেই দাবি করেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁদের কাজ করতে দেওয়া হয়নি বা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকার কারণে তাঁদের বসিয়ে রাখা হয়েছে। অভিনেত্রীর বক্তব্য, এই ধরনের অভিযোগ করার আগে প্রত্যেক শিল্পী ও কলাকুশলীর নিজের যোগ্যতার দিকটিও বিচার করা উচিত। তাঁর মতে, কেউ যদি কাজ না জানেন বা নিজের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করতে না পারেন, তাহলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে সেই ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দেওয়া ঠিক নয়।

একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, এমন মানুষও রয়েছেন যারা সত্যিই রাজনৈতিক কারণে কাজ থেকে দূরে ছিলেন। তাই তাঁর প্রস্তাব, শিল্পী ও কলাকুশলীদের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আরও স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকা উচিত। কার্ড বা পরিচয়পত্র পাওয়া মানেই যে প্রত্যেকে সমান দক্ষ, তা নয়। কাজ জানা এবং না-জানা মানুষকে আলাদা করে তাঁদের দক্ষতা অনুযায়ী সুযোগ দেওয়া উচিত বলেই মনে করেন তিনি। এই প্রসঙ্গেই ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর নিজের শুরুর দিনের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও জানান অভিনেত্রী। ছোটবেলায় ধারাবাহিকে কাজ করার সময়ই সিনেমায় একাধিক প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একটি প্রস্তাবে তাঁর মায়ের সামনেই অত্যন্ত অশালীন ও অপমানজনক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই ঘটনার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এমন কিছু করে কখনও কাজ করবেন না। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “আমি অভিনয় করতে এসেছি, অসভ্যতা করতে আসিনি।”

অর্থাৎ অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার জন্য নিজের সম্মান বা নীতিবোধ বিকিয়ে দিতে তিনি রাজি ছিলেন না। সেই ঘটনার প্রভাবেই পরবর্তীকালে ভালো প্রস্তাব এলেও অনেক ক্ষেত্রে তিনি আর সেভাবে আগ্রহ দেখাননি বলে জানান। ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমিলা। তাঁর মতে, এখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিভার পরিবর্তে লবি, পরিচিতি এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের টাইপকাস্ট করার প্রবণতারও সমালোচনা করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে নেতিবাচক চরিত্রে দেখা গেলেও প্রতিটি চরিত্রকে আলাদা করার চেষ্টা করেন বলে জানান অভিনেত্রী। তাঁর অভিযোগ, যাঁরা কাস্টিং করেন তাঁরা অনেক সময় ঝুঁকি নিতে চান না বলেই একই ধরনের চরিত্রে একই শিল্পীদের ব্যবহার করেন। সিনেমার ক্ষেত্রেও তারকানির্ভরতা ও পরিচিত মুখের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, বড় তারকা বা বড় পরিচালক থাকলেই ভালো সিনেমা হয় না, আসল বিষয় হল গল্প বলার ক্ষমতা।

বড় পর্দায় দর্শককে সেই অভিজ্ঞতা দিতে না পারলে মানুষ অন্য ভাষার সিনেমার দিকে চলে যাবেই। একইসঙ্গে রাজনীতির সঙ্গে শিল্পীদের সম্পর্ক নিয়েও তাঁর অবস্থান পরিষ্কার। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা শিল্পীদের সম্মান জানাতেই পারেন, কিন্তু কোনও শিল্পীর নিজের পরিচয় ও প্রতিভাকে রাজনৈতিক আনুকূল্যের কাছে বিকিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তাঁর কথায়, শিল্পীর পরিচয় তাঁর নিজের কাজ এবং প্রতিভা থেকেই তৈরি হওয়া উচিত। সবশেষে ব্যক্তিগত জীবন ও মূল্যবোধের কথাও তুলে ধরেছেন এমিলা। পরিবার তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে কখনও নিজের কেরিয়ারের ‘ত্যাগ’ বলে মনে করেন না তিনি। মেয়ের পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্বের কারণে মুম্বইয়ে কাজের বেশ কিছু সুযোগ গ্রহণ করতে পারেননি, কিন্তু সেটাকে তিনি ‘স্যাক্রিফাইস’ বলতে নারাজ। তাঁর মতে, সন্তান ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য, কারও জন্য করা ত্যাগ নয়।

আরও পড়ুনঃ “কুচকুচে কালো থেকে ফর্সা হওয়ার ক্রিম ও ক্যাপসুলের খোঁজে নাকি দলে দলে লোক…” নবমিতা চট্টোপাধ্যায়ের ‘উত্তম কুমার কালো ছিলেন, একেবারে উড়ে পুরুত’ মন্তব্য বিতর্কের মাঝেই নজিরবিহীন কটাক্ষ, প্রাক্তন স্বামী ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়ের! সরগরম সমাজ মাধ্যম, প্রাক্তন স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে কী বললেন অভিনেতা?

একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, একজন শিল্পী হিসেবে যেমন অন্যের কাছ থেকে সম্মান পাওয়ার দাবি থাকে, তেমনই শিল্পীদেরও সাধারণ মানুষকে সম্মান করার দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে কাউকে কটু কথা বলা বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা তাঁর পছন্দ নয়। বরং কোনও বিষয় খারাপ লাগলে সেটি এড়িয়ে যাওয়াকেই তিনি শ্রেয় মনে করেন। তাঁর বিশ্বাস, অন্যকে আঘাত করে কেউ নিজের ভালো করতে পারে না। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতার পরেও তাই নিজের নীতি, আত্মসম্মান ও কাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকেই আঁকড়ে রয়েছেন এমিলা ভট্টাচার্য। নতুন কাজের অপেক্ষায় থাকলেও নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজসেবা, লেখালেখি ও নিজের নতুন কিছু করার পরিকল্পনাতেও সময় দিচ্ছেন তিনি।

You cannot copy content of this page