প্রযুক্তির উন্নতি মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে, এ নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই যখন মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিতে শুরু করে, তখন উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে স্মার্টফোনের ব্যবহার এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অনেকেই কাজের মধ্যেও ফোন থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারছেন না। এই প্রবণতা শুধু সাধারণ জীবনে নয়, পেশাদার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অনেক অভিজ্ঞ মানুষ। সম্প্রতি সেই বিষয়েই সরব হলেন টলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা ‘শুভাশিষ মুখোপাধ্যায়’ (Subhasish Mukhopadhyay)। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাজের প্রতি মনোভাব নিয়ে তিনি খোলাখুলি নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, একাগ্রতা ছাড়া কোনও সৃজনশীল কাজ দীর্ঘদিন ধরে ভালোভাবে করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শুভাশিষ জানান, শুটিং ফ্লোরে এমন দৃশ্য তিনি প্রায়ই দেখেন যেখানে ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক শিল্পী মোবাইল ফোনে ডুবে যান। চরিত্র, সংলাপ বা দৃশ্য নিয়ে ভাবনার পরিবর্তে তাঁদের মনোযোগ চলে যায় স্ক্রিনে। এই অভ্যাস তাঁর কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর বলে মনে হয়। এমনকি তিনি মজার ছলেই বলেন, অনেক সময় এতটাই বিরক্ত লাগে যে চড় মেরে দিতে ইচ্ছে করে। অভিনেতার মতে, অভিনয় করতে এলে কিছু সময়ের জন্য হলেও ফোন থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ অভিনয়ের মতো পেশায় মনোসংযোগই সবচেয়ে বড় শক্তি। বারবার মন অন্যদিকে চলে গেলে চরিত্রের গভীরে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়ে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত শুভাশিষ মুখোপাধ্যায় নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকেই এই মন্তব্য করেছেন। বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে তিনি মূলত অসাধারণ কমিক টাইমিংয়ের জন্য পরিচিত হলেও তাঁর অভিনয়জীবন শুধুমাত্র হাসির চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়। নানান ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন বারবার। ‘হারবার্ট’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় এখনও প্রশংসিত হয়। আবার ‘মহালয়া’ ছবিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভূমিকায় অভিনয় করেও তিনি বিশেষভাবে নজর কেড়েছিলেন। ‘হত্যাপুরী’ থেকে শুরু করে আজও তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে সমান প্রশংসিত।
শুভাশিষের বক্তব্যে শুধু ফোন ব্যবহারের সমালোচনা নয়, কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, অভিনয় শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা পাওয়ার মাধ্যম নয়, এর জন্য দরকার নিয়মিত চর্চা, নিষ্ঠা এবং পেশাদার মানসিকতা। সেই কারণেই নতুন প্রজন্মের অনেকের কাজের ধরন দেখে তিনি হতাশ হন। এক পর্যায়ে অভিনেতা রেগে গিয়ে বলেন, “সততা আর ডেডিকেশন যদি না থাকে, তাহলে কী হবে তোদের এখানে এসে? তোদের আসতেই বা কে বলেছে, কে মাথার দিব্যি দিয়েছে?” তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট, তিনি প্রতিভার পাশাপাশি পরিশ্রম এবং দায়িত্ববোধকেও সমান গুরুত্ব দেন। শুধুমাত্র রূপ থাকলেই একজন ভালো শিল্পী হওয়া যায় না বলেই তাঁর বিশ্বাস।
আরও পড়ুনঃ রাজ্যে পালাবদলের পর বড় ধাক্কা! আরজি কর কাণ্ড ঘিরে ‘অপরাধ’ সামনে আসতেই ফাঁসলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়! চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ঘিরে, থানায় লিখিত পড়ল জমা! তৃণমূলের অভিনেত্রী-সাংসদ এবার কী নিয়ে চরম বিপাকে?
বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যম এবং স্মার্টফোন মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠলেও তার অতিরিক্ত নির্ভরতার ফল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মনোযোগ ধরে রাখার সমস্যা নিয়ে নানা ক্ষেত্রেই আলোচনা হচ্ছে। শুভাশিষ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য সেই আলোচনাকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ব্যবহার অবশ্যই দরকার, কিন্তু তা যেন কাজের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। অভিনয় জগতের উদাহরণ টেনে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা শুধু শিল্পীদের জন্য নয়, অন্য পেশার মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে কোনও কাজে সাফল্য পেতে হলে মনোযোগ, ধৈর্য এবং নিষ্ঠার বিকল্প নেই, আর সেই জায়গাতেই নতুন প্রজন্মকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা।






