বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen) এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় (Sabitri Chatterjee) এমন দুই কিংবদন্তি, যাঁদের অবদান আজও সমানভাবে স্মরণ করেন দর্শকরা। একজন তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্য ও অভিনয় দিয়ে বাংলা সিনেমার রোম্যান্টিক নায়িকার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন, অন্যজন স্বাভাবিক অভিনয়ের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন ঘরের মেয়ে। বহু জনপ্রিয় ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা। পর্দায় তাঁদের অভিনয় যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনই শুটিংয়ের আড়ালের নানান মুহূর্তও আজ কৌতূহলের বিষয়। নিজের স্মৃতিচারণায় সেই সব অজানা অভিজ্ঞতারই কিছু অংশ তুলে ধরেছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়।
সেখানে উঠে এসেছে ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ ছবির শুটিংয়ের একাধিক মজার, আবেগঘন এবং ব্যতিক্রমী ঘটনা, যার কেন্দ্রে ছিলেন সুচিত্রা সেন, যাঁকে সাবিত্রী স্নেহ করে ‘রমাদি’ বলেই ডাকতেন। ‘সম্পূর্ণ সুচিত্রা আনন্দলোক সংকলন’-এ (২৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৭) প্রকাশিত ‘সুচিত্রাদির সঙ্গে কোনওদিন হৃদ্যতা হয়নি’ শীর্ষক স্মৃতিচারণায় সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, তখনকার বাংলা চলচ্চিত্রের পরিবেশ আজকের থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা কাজ হলেও স্টুডিওর পরিবেশ এতটাই আন্তরিক ছিল যে, একবার ঢুকে পড়লে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করত না। সেই সময় পরিচালকরা শিল্পীদের নিয়ে ধৈর্য ধরে কাজ করতেন এবং চরিত্র গড়ে তুলতে যথেষ্ট সময় দিতেন। অভিনেত্রী হিসেবে সুচিত্রা সেন সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাবিত্রী জানান, অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করতেন রমাদির অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি কী ছিল।
তাঁর উত্তর ছিল, “ওঁর মধ্যে মারাত্মক ছিল যেটা, তা হল হাসি আর কান্না। ওই হাসি দিয়েই উনি সবাইকে মাত করে দিতেন। আমার মনে হয়, কান্নার বিষয়টা তাঁকে শিখিয়েছিলেন দেবকী বসু, ‘ভগবান শ্রীচৈতন্য’ ছবির সময়। তখনকার পরিচালকরা শিল্পীদের পিছনে অনেক সময় দিতেন। এখন আর সেই পরিবেশ কোথায়!” ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ ছবির শুটিংয়েও ঘটেছিল এক মজার ঘটনা। ছবিতে সাবিত্রী ও সুচিত্রা দুই বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তাঁদের মা ছিলেন শোভা সেন এবং বাবা নরেশ মিত্র। শুটিংয়ের আগে শোভা সেন ভালো একটি শাড়ি পরিয়ে দেন সাবিত্রীকে। কিন্তু ফ্লোরে পৌঁছতেই পরিচালক নরেশ মিত্র রেগে যান। তিনি বলেন, “এটা কি রাজরানির বই হচ্ছে? এত ভালো শাড়ি পরে এসেছো?”
সাবিত্রী জানিয়েছিলেন, শোভা সেনই তাঁকে শাড়িটি পরতে বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য শাড়ি বদল করতেই হয়। সাবিত্রীর ধারণা, সেই ঘটনাটি সুচিত্রা সেন দেখেছিলেন। তখন কিছু না বললেও বিষয়টি তাঁর ভালো লাগেনি বলেই মনে হয়েছিল অভিনেত্রীর। যদিও নিজের লেখায় সাবিত্রী এটিকে নিছক মজার ঘটনাই বলেছেন, তবে কোথাও যেন তাঁর মনে হয়েছিল, রমাদিরও হয়তো বিষয়টি খারাপ লেগেছিল। এর কিছুক্ষণ পরেই শুটিং চলছিল ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের। গল্প অনুযায়ী, প্রবল ঝড়ে একটি গাছ চাপা পড়ে বাবার মৃত্যু হয়। সেই দৃশ্যে দুই বোন এবং তাঁদের মা বাইরে বেরিয়ে এসে বাবাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। ঠিক তখনই সুচিত্রা সেন আস্তে করে সাবিত্রীকে বলেছিলেন, “এই আস্তে আস্তে করো। থাক কিছুক্ষণ গাছ চাপা হয়ে।”
হঠাৎ এমন কথা শুনে সাবিত্রী হেসে ফেলেছিলেন। পরিচালক নরেশ মিত্র অবশ্য কিছুই বুঝতে পারেননি। পরে আরেকটি আবেগঘন দৃশ্যে বাবার মৃতদেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই বোনের কান্নার অভিনয় করার কথা ছিল। ঠিক সেই সময় সুচিত্রা সেন ফিসফিস করে সাবিত্রীকে বলেছিলেন, “একদম কাঁদবি না।” সাবিত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তাহলে কী করব?” তখন সুচিত্রার উত্তর ছিল, “হি হি করে হাস, মুখ ভ্যাংচা। তোর যা ইচ্ছে কর। এই লোকটার জন্য চোখের জল ফেলিস না।” শুটিংয়ের মাঝেই এমন রসিকতা করে পুরো পরিবেশ হালকা করে দিয়েছিলেন তিনি। তবে শুধুই মজা নয়, অভিনয় নিয়েও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মনে ছিল সুচিত্রা সেনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে খুব একটা ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও কখনও সেই দূরত্ব অভিনয়ে প্রভাব ফেলতে দেননি তাঁরা। দু’জনেই নিজেদের চরিত্রের প্রতি সমানভাবে নিবেদিত ছিলেন। সাবিত্রীর মতে, সুচিত্রা সেন অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন এবং শুটিং ফ্লোরে মাঝেমধ্যেই এমন ছোট ছোট মজার ঘটনা ঘটিয়ে সবাইকে হাসিয়ে রাখতেন। সেই কারণেই কঠিন বা আবেগঘন দৃশ্যের মধ্যেও কাজের পরিবেশ কখনও ভারী হয়ে উঠত না। এই অভিজ্ঞতাগুলো আজও তাঁর স্মৃতিতে অমলিন হয়ে রয়েছে। নিজের লেখার শেষে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জনপ্রিয় জুটির প্রসঙ্গও টেনেছেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন, রমাদিকে নিয়ে লিখতে বসলেই স্বাভাবিকভাবেই উত্তম-সুচিত্রা জুটির কথা উঠে আসে।
আরও পড়ুনঃ “হাইসিয়াত বোঝা যায় শত্রুর সংখ্যা দেখে…সমালোচনা যত বাড়বে, বুঝবে ঠিক পথেই এগোচ্ছ!” গীতার বাণী তুলে ধরে কড়া বার্তা পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের! ‘তোমার নামে বলা কোনও কথা বা অসৌজন্যমূলক আচরণ মূল্যহীন, যতক্ষণ না তুমি সেটাকে গুরুত্ব দিচ্ছ’ কোন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এমন মন্তব্য গায়িকার? আপনারাও কি তাঁর সঙ্গে সহমত?
তবে কেন সেই জুটি এত জনপ্রিয় হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারবেন না বলেও জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে দু’জনকে মোটেই প্রচলিত অর্থে রোম্যান্টিক জুটি মনে হয়নি। আবার ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-এ সুচিত্রা বড় বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং গল্পের মাঝপথেই তাঁর চরিত্রের মৃত্যু হয়। পরে উত্তম কুমারের সঙ্গে মিলন হয় সাবিত্রীর চরিত্রের। তাই এই ছবিকে শুধুমাত্র উত্তম-সুচিত্রার ছবি বলাও ঠিক নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এই স্মৃতিচারণার প্রতিটি লাইনে স্পষ্ট, পর্দার সামনে যত বড় শিল্পীই হোন না কেন, ক্যামেরার আড়ালে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে ছিল হাসি, খুনসুটি, পেশাদারিত্ব এবং একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।






