“গুরুর মৃ’ত্যু যতটা কষ্ট দিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি য’ন্ত্রণা দিয়েছিল গুরুর…” ‘জান গুরু’ উৎপল দত্তকে নিয়ে কোন মন্তব্যে ভেঙে পড়েছিলেন চন্দন সেন? অপমানের ক্ষ’ত, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও দু’বার থিয়েটার দল থেকে বিতাড়ন! অন্তরালে লুকিয়ে থাকা জীবনের কোন অধ্যায় সামনে আনলেন অভিনেতা?

বাংলা থিয়েটার ও সিনেমার জগতে চন্দন সেন শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি এক সমাজমনস্ক কণ্ঠস্বর। মঞ্চ ও পর্দা—দুই জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি গভীর, চিন্তাশীল এবং প্রায়শই প্রতিবাদী। অভিনয়ের ভেতর দিয়ে সমাজের অসঙ্গতি, ক্ষমতার রাজনীতি এবং মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরাই যেন তাঁর শিল্পচর্চার মূল লক্ষ্য। তাই তাঁকে ঘিরে আলোচনা কেবল শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পৌঁছে যায় সমাজ-রাজনীতির বিতর্কের কেন্দ্রে।

চন্দন সেন বারবার বলেছেন, অভিনয় কেবল ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে উপার্জনের মাধ্যম নয়। তাঁর মতে, থিয়েটার, সিরিয়াল বা সিনেমা যখন শুধু “এন্টারটেইনমেন্ট”-এ সীমাবদ্ধ থাকে, তখন শিল্পের গভীরতা হারিয়ে যায়। বিনোদন জগতে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, মত প্রকাশের কারণে অনেক শিল্পীকেই অলিখিতভাবে ‘ব্যান’ করা হয়, এবং কাজ থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর শিক্ষা—অভিনয় মানে সমাজের অন্যায় ও শক্তির খেলা প্রকাশ করা। তিনি মনে করেন, শিল্পীর দায়িত্ব শুধু চরিত্র নির্মাণ নয়, বরং সমাজের সত্যকে তুলে ধরা।

চন্দন সেনের জীবনে গুরু হিসেবে সবচেয়ে বড় নাম উৎপল দত্ত। তাঁকে তিনি “জান গুরু” বলে উল্লেখ করেন। উৎপল দত্তের মৃত্যুর সময় তিনি শোকাহত হয়েছিলেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কেঁদেছিলেন অন্য এক কারণে। তাঁর নিজের শিক্ষক রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত কোনও এক প্রসঙ্গে উৎপল দত্ত সম্পর্কে কিছু হালকা ও কৌতুক-মিশ্রিত মন্তব্য করেছিলেন—যেখানে তাঁকে “বারবার কমিউনিস্ট হওয়ার চেষ্টা” বা গভীর চরিত্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ বলে ইঙ্গিত করা হয়। চন্দন সেনের মতে, এই ধরনের মন্তব্য উৎপল দত্তের মানবিকতা ও নাট্যচেতনার গভীরতাকে ছোট করে দেখায়। তিনি বলেন, গুরুর মৃত্যু যতটা কষ্ট দিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিয়েছিল গুরুর সম্মানহানি।

চন্দন সেন জানিয়েছেন , জীবনে দু’বার তিনি দল থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। প্রথমবার বামফ্রন্ট আমলে কিছু বিষয়ে খোলাখুলি মত প্রকাশ করায় রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয় এবং দলীয় অসন্তোষের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। দ্বিতীয়বার ২০১১–১৩ সালের মধ্যে, তাঁর প্রতিবাদী অবস্থান ও রাজনৈতিক মতামতের কারণে কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুটিং সেটে নাম বাদ দেওয়া, এমনকি দু’চাকা বাইকে এসে হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে—যে তিনি থাকলে শুটিং চলবে না। এই কঠিন সময়কে তিনি নেতিবাচক হলেও শিক্ষামূলক অধ্যায় বলে মনে করেন। তাঁর বিশ্বাস, সত্য কথা সাময়িকভাবে চাপা পড়লেও শেষ পর্যন্ত কাজের মানই শিল্পীকে ফিরিয়ে আনে।

আরও পড়ুনঃ ‘মু’টিয়ে গেছ!’ ‘এই দে’হ নিয়ে কোম’র দোলাচ্ছেন, নিজেকে আয়নায় দেখেছেন?’ লাগাতার ট্রো’লিংয়ে অতিষ্ঠ, এবার আইনি পথে হাঁটলেন শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়! কোথায় জানালেন অভিযোগ?

উৎপল দত্তকে “জান গুরু” বললেও, হাতে-কলমে থিয়েটারের পাঠ তিনি পেয়েছেন রমাপ্রসাদ বণিক-এর কাছ থেকে, যাঁকে তিনি “কর্মগুরু” বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিভাস চক্রবর্তী, অরুণ মুখোপাধ্যায় ও অশোক মুখোপাধ্যায়-দের তিনি ‘মাস্টারমশাই’ হিসেবে স্মরণ করেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি নাট্যভাষা, চরিত্র নির্মাণ ও সমাজ-সচেতন নাট্যবোধের শিক্ষা পেয়েছেন। চন্দন সেনের কথায়, এই গুরুদের কারণেই তিনি শুধু অভিনেতা নন, একজন আদর্শচেতন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছেন। রাজনীতি, প্রতিবাদ ও অভিনয়—এই তিনকে একসঙ্গে বহন করার শক্তি তিনি সেখান থেকেই পেয়েছেন।

You cannot copy content of this page