আজ ২৯ মার্চ, প্রখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের (Utpal Dutt) জন্মদিন ঘিরে তাঁর কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত তুলে ধরলেন একান্ত পারিবারিক স্মৃতি। তিনি জানান, বাবা বেঁচে থাকলে এ বছর তাঁর বয়স হত ৯৭। জন্মদিন এলেই তাঁদের ঘর ভরে উঠত আনন্দ আর ছোট ছোট উদযাপনে। বড় কোনও আড়ম্বর নয়, বরং ঘনিষ্ঠ মানুষদের নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশেই কাটত বিশেষ দিনটি। বাবা-মেয়ে দু’জনেই একে অপরের জন্মদিন উদযাপন করতে ভালোবাসতেন। প্রতি বছর বাবাকে বই উপহার দিতেন তিনি, এমন বই যা পড়ার ইচ্ছে বাবার ছিল। সঙ্গে থাকত পছন্দের নানা খাবার, কারণ খাওয়া-দাওয়াও ছিল তাঁদের আনন্দের বড় অংশ। বাইরে লোক ডেকে অনুষ্ঠান করার প্রবণতা তাঁদের পরিবারে ছিল না বলেই জানান তিনি।
বিষ্ণুপ্রিয়া দত্তের কথায়, উৎপল দত্ত শুধু মঞ্চ বা পর্দার মানুষ ছিলেন না, ঘরেও ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও রঙিন স্বভাবের। তাঁর ব্যক্তিত্বে যেমন শিল্প ছিল, তেমনই গভীরভাবে মিশে ছিল রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা। এই দুই দিক মিলেই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়েছে সকলের কাছে। পরিবারের কাছে যেমন তিনি প্রেরণা, তেমনই বহু মানুষের কাছেও তিনি আদর্শ হয়ে ওঠেন। তাঁর মতে, বাবার জীবন আর নাটক একে অপরের থেকে আলাদা করা যায় না। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী উৎপল দত্ত তাঁর নাটকের মাধ্যমে সমতার সমাজ গঠনের কথা বলতেন। থিয়েটারকে তিনি শুধুমাত্র বিনোদন নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেই দেখতেন।
বর্তমান সমাজের পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া বলেন, প্রতিবাদের ভাষা যেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যার আশঙ্কা তাঁর বাবা অনেক আগেই করেছিলেন। তাঁর ‘একলা চলো রে’ নাটকে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের উত্থান বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে দেখানো হয়েছিল কীভাবে চরম ডানপন্থী চিন্তাধারা সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে। উৎপল দত্ত এই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কে আগেভাগেই সচেতন ছিলেন বলে জানান তাঁর মেয়ে। আজকের পরিস্থিতিতে তিনি থাকলে হয়তো আরও নতুনভাবে ইতিহাস ও রাজনীতিকে তুলে ধরতেন, এমনটাই মনে করেন বিষ্ণুপ্রিয়া।
পারিবারিক জীবনে উৎপল দত্ত ছিলেন একেবারেই ভিন্ন ধরণের মানুষ। তাঁদের পরিবারে কোনও পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব বা শ্রেণিবিভাজন ছিল না। একজন সত্যিকারের মার্ক্সবাদী হিসেবে তিনি নারী-পুরুষ সমতায় বিশ্বাস করতেন। সংসারের আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশই ছিল তাঁর স্ত্রীর হাতে, এবং সেই স্বাধীনতাকে তিনি গুরুত্ব দিতেন। স্ত্রী ও মেয়েকে তিনি সহযোদ্ধা বা ‘কমরেড’ হিসেবে দেখতেন, যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল সমতা, সম্মান ও বোঝাপড়া। কখনও উচ্চস্বরে কথা বলেননি তিনি, বরং ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ “দম আটকে যাচ্ছিল যন্ত্র’ণায়, কাল রাতেই ইমারজেন্সি বেসিসে ভর্তি করতে হলো মাকে” বিয়ে মিটতেই বড় বিপদ সুকান্তর পরিবারে! নতুন বউ বাড়িতে পা রাখতেই অসুস্থ শাশুড়ি মা, রাতারাতি অপারেশন! কী হয়েছিল? এখন কেমন আছেন তিনি?
নাট্যচর্চার ক্ষেত্রেও পরিবার ছিল তাঁর সঙ্গী। কোথাও ঘুরতে গেলেও তাঁর লেখার কাজ থেমে থাকত না। সন্ধেবেলায় নতুন লেখা দৃশ্য পরিবারকে শুনিয়ে মতামত নিতেন। কালিম্পং ভ্রমণের সময় তিনি ‘দাঁড়াও পথিকবর’ লিখছিলেন, যেখানে ‘রেবেকা’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তাঁর মেয়ে। এমনকি ‘অগ্নিশয্যা’ লেখার সময়ও মেয়ের পড়া ইতিহাসভিত্তিক লেখালেখি থেকে তিনি উৎসাহ পেয়েছিলেন। সমসাময়িকদের সঙ্গে তাঁর ভাবনার কিছু পার্থক্য থাকলেও নিজের আদর্শে অটল ছিলেন তিনি। সমাজের শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শিল্পী হিসেবে তাঁকে দেখেন তাঁর কন্যা। তাঁর কাজকে শুধুমাত্র প্রচার হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলেও মত তাঁর।






