সমুদ্রের ধারে শুটিং চলছিল, একেবারে স্বাভাবিক একটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সবকিছু। ‘মধুচন্দ্রিমা’র দৃশ্যের জন্য জলে নামার পরিকল্পনা ছিল সীমিত সময়ের জন্যই। কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতি বদলে যায়, ঢেউ বাড়তে থাকে, আর সেই অপ্রত্যাশিত মুহূর্তেই বিপদে পড়েন ‘রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়’ (Rahul Arunoday Banerjee)। সহকর্মীরা ছুটে এলেও সময় যেন হাতছাড়া হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি। মাত্র ৪২ বছর বয়সে এমন পরিণতি শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। যেন তাঁর সেই সহজ স্বীকারোক্তিই আজ আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা নিয়ে। শুটিং সেটে কতটা প্রস্তুতি থাকে, কতটা সচেতনতা বজায় রাখা হয়। এসব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ এই মৃত্যু শুধুই একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি এক ধরনের সতর্কবার্তাও। বিশেষ করে যখন একজন অভিজ্ঞ অভিনেতাও এমন পরিস্থিতির শিকার হন, তখন বোঝা যায় ঝুঁকির জায়গাগুলো কতটা বাস্তব। তাঁর নিজের কথাতেই যেন একটা জীবনের অভিজ্ঞতা ধরা পড়ে। গত বছর ছেলে সহজের উদ্দেশ্যে তিনি একটি চিঠি লিখেছিলেন। “এই চিঠিটা আজকে ‘ফাদারস ডে’ বলে লিখতে বসা…আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত।”
তিনি সেখানে লেখেন, “এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার… প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও।” পেশার বাইরে রাহুলের জীবনের বরাবর গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর পরিবার। একসময় প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি, সবই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তাঁদের ছেলে, সহজ বন্দ্যোপাধ্যায়। ছেলের ভবিষ্যৎ আর মানসিক জগতের কথা ভেবেই তাঁরা আবার কাছাকাছি আসেন, নতুন করে সংসার গড়ার চেষ্টা করেন।
যেন সেই অনুভূতিরই প্রতিধ্বনি “যে দিন আমরা প্রথম খবর পাই, তুমি আমাদের জীবনে আসছো, আমরা আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম…(সহজকে লেখা রাহুলের শেষ চিঠি)”। এই ফিরে আসাটা নিছক সম্পর্ক জোড়া লাগানো ছিল না, বরং একটা সচেতন সিদ্ধান্ত। বাবা-মা হিসেবে দায়িত্ববোধই এখানে বড় হয়ে উঠেছিল। তাই আজ যখন রাহুল নেই, তখন সবচেয়ে বড় শূন্যতা যে সহজের জীবনে তৈরি হলো, তা বলাই বাহুল্য। খুব অল্প বয়সেই বাবাকে হারানোর এই অভিজ্ঞতা কোনওভাবেই সহজ নয়। সেই কারণেই হয়তো তিনি ছেলেকে আগেই বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, “আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই।
পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না” (সহজকে লেখা রাহুলের শেষ চিঠি)। এই প্রেক্ষাপটেই সামনে আসে রাহুলের লেখা সেই চিঠি, যেটা তিনি ছেলের জন্য লিখেছিলেন। সেখানে কোনও নায়কোচিত ভাষণ নেই, নেই বড় বড় উপদেশের ভার। বরং খুব সাধারণ কিছু কথা, জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা কিছু উপলব্ধি। তিনি নিজের শুরুর দিনের গল্প বলেছেন, কীভাবে একেবারে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে হয়েছে। সেই পথটা যে সহজ ছিল না, সেটাও ইঙ্গিত করেছেন, “একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে।
দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে…(সহজকে লেখা রাহুলের শেষ চিঠি)”। চিঠির একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সহজের মাকে নিয়ে তাঁর ভাবনা। তিনি বুঝিয়েছেন, একজন মা হিসেবে কতটা ত্যাগ, কতটা নীরব লড়াই লুকিয়ে থাকে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। সন্তানের কাছে সেই অদৃশ্য সংগ্রামের মূল্য বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে শিখিয়েছেন মানুষের প্রতি সম্মান, সে যে-ই হোক, যে কাজই করুক। তাঁর কথাতেই সেই গভীরতা ধরা পড়ে, “মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে নাও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে (সহজকে লেখা রাহুলের শেষ চিঠি)।”
আরও পড়ুনঃ পর্দার ভালোবাসা ছুঁয়েছিল বাস্তবকে, কিন্তু শেষে আর বলা হলো না ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’! রাহুল-প্রিয়াঙ্কার রূপকথার করুণ পরিণতি! স্বামীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ অভিনেত্রী! অপূর্ণ হলেও, জানেন তাঁদের প্রেম কাহিনীর শুরুটা?
সবশেষে, রাহুল যেন ছেলেকে দিয়ে গেছেন কিছু অদৃশ্য উত্তরাধিকার। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, শহরের স্মৃতি, আর সবচেয়ে বড় কথা নিজের ভাষার গর্ব। কোনও সম্পত্তি নয়, বরং ভাবনা আর মূল্যবোধই তাঁর আসল সম্পদ ছিল। সেই উত্তরাধিকারের কথাই তিনি সহজ করে লিখে গেছেন, “তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস… আমার ভাষা, বাংলা (সহজকে লেখা রাহুলের শেষ চিঠি)”। আজ তিনি নেই, কিন্তু এই কথাগুলো থেকেই বোঝা যায়, একজন বাবা হিসেবে তিনি কী রেখে যেতে চেয়েছিলেন। আর সেখানেই হয়তো তাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে।






“জা’নোয়ারেরও অধম, জু’তিয়ে সিধে করা উচিত…বামপন্থী হতেই পারে, কারুর পাকা ধানে মই দিতে যায়নি!” রাহুল অরুণোদয়ের আকস্মিক মৃ’ত্যুতে রাজনৈতিক আদর্শ টেনে, নেটিজেনদের অশ্লীলতা ও উল্লাসে তোপ কুণাল ঘোষের!