“আশা করার প্রশ্নই জাগে না…রাজ্যের শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়েছে, জনতা উত্তর দিয়েছে, দরকারে আবারও দেবে” বাংলায় গেরুয়া সরকারের শাসন শুরু হতেই মুখ খুললেন বামমনস্ক কৌশিক সেন, মানসী সিনহা, ঊষসী চক্রবর্তী ও চন্দন সেন! আশা না শঙ্কা? কী দাবি জানালেন, কী বলছেন তাঁরা?

গত ৯ মে, ব্রিগেড ময়দানে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল বাংলা। দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবার বাংলায় বিজেপি সরকার গঠিত হল। ব্রিগেডের বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হুডখোলা গাড়িতে হাত নেড়ে মূল মঞ্চে পৌঁছন। মঞ্চে উঠে নতজানু হয়ে প্রণাম জানানোয় উপস্থিত জনতার মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। সেই মঞ্চেই রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী এবং বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। শপথের দিন হিসেবে রবীন্দ্রজয়ন্তী বেছে নেওয়াও আলাদা তাৎপর্য তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের এই মুহূর্তে টলিউডের একাংশে যেমন আশার সুর, তেমনই অন্য অংশে রয়েছে অপেক্ষা ও সতর্ক দৃষ্টি। শিল্পী মহলের একাধিক পরিচিত মুখ নতুন সরকার নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন।

অভিনেতা কৌশিক সেন নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে নিজের প্রত্যাশার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, “বিপুল সংখ্যক ভোটে জিতে এই সরকার গঠিত হয়েছে। আশা করব পুরনো সরকারের সকল সমস্যা, দুর্নীতি মুছে একটা মুক্ত রাজ্য গঠন করবে। যেখানে প্রত্যেকটা মানুষ ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।” তিনি আরও বলেন, “সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু গ্রামে থাকে। সরকারি সুবিধাগুলো কিন্তু শহুরে মানুষদের থেকে তাঁদের অনেক বেশি প্রয়োজন।” কৌশিকের মতে, নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থারও প্রসার দরকার বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কথায়, “যাঁরা নিম্নবিত্ত, অসহায় তাঁদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হোক।

আরও পড়ুন: “মায়ের পরিচয় শুধু জন্মদানে নয়” মা না হয়েও তিনি মা! হারিয়েছেন নিজের মাকে, মাতৃদিবসে সুদীপা চট্টোপাধ্যায় শোনালেন বিশ্বজননী দেবী দুর্গার মাতৃত্বের কোন গল্প?

সর্বক্ষেত্রে শিক্ষার বিকাশ ঘটুক। একজন নাগরিক হিসেবে এটুকুই আমার আশা।” সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অভিনেত্রী মানসী সিনহাও পরিবর্তনের পক্ষে আশাবাদী মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “পনেরো বছরে গোটা রাজ্যের শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়েছে। দিকে দিকে সিন্ডিকেট রাজ চলেছে।” নতুন সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশা, “একটা সুন্দর বসবাসযোগ্য রাজ্য গড়ে তুলবে। সরকারি স্কুলগুলো তাদের হারানো ঐতিহ্য, মর্যাদা ফিরে পাবে।” তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, মানুষের সন্তুষ্টিই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মানসীর কথায়, “একটা বিষয় অবশ্যই যেন মাথায় রাখে, জনতা যেন সন্তুষ্ট হয়। একবার যখন জনগণ উত্তর দিয়েছে তখন বারবার দেবে সেই বিষয়ে কিন্তু, আর কোনও সন্দেহ রইল না।”

তিনি আরও বলেন, “মমতা-অভিষেক জুটির শাসানির উত্তর জনতা জনার্দন দিয়েছে। রাজ্যের উন্নতিই কাম্য।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, পরিবর্তনের সঙ্গে উন্নয়নও চাইছেন তিনি। অভিনেত্রী ঊষসী চক্রবর্তীও নতুন সরকারকে ঘিরে আশার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, “নতুন সরকার এসেছে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে। এ রাজ্যের অসংখ্য মানুষ ভোট দিয়ে তাঁদের জিতিয়েছেন, আশা করি নতুন সরকার তাঁদের ভরসার দাম দেবেন।” বাংলার সামাজিক বৈচিত্র্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এ রাজ্যের মাটির মতোই বৈচিত্রে ভরা। নানা ধর্ম, নানা সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে পাশাপাশি থেকে এসেছেন!” শপথের দিন হিসেবে রবীন্দ্রজয়ন্তী বেছে নেওয়া নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন, “শপথগ্রহণের দিন যেটা নির্বাচন করেছে সরকার, আশা করব বাংলার আত্মার মর্মের এই ধ্বনি তাঁদের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছবে।”

আরও পড়ুন : “দিদিকে বলব, তোকে বুঝে নিচ্ছি” ক্ষমতার দাপটে হু’মকির অভিযোগ! মমতা সরকারের পতন ঘটতেই বিপাকে, এবার আর্টিস্টস ফোরাম থেকে পদত্যাগ করলেন দিগন্ত বাগচী?

পাশাপাশি তাঁর দাবি, “সাধারণ নাগরিক হিসাবে আপাতত শান্তি চাই, আইনের শাসন চাই। রাজনীতির নাম করে যে হানাহানি চলছে, নতুন সরকার তা বন্ধ করার জন্য সক্রিয় হোন আপাতত এইটুকুই চাই।” শান্তিপূর্ণ পরিবেশই এখন মানুষের প্রধান চাহিদা বলে জানান তিনি। টলিউডের কাজের পরিবেশ নিয়েও সরব হন ঊষসী। তাঁর কথায়, “শিল্পী হিসেবে টলিউডে সুস্থ পরিবেশ চাই। কোনও বিশেষ দলের তাঁবেদারি না করে যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের পরিবেশ ফেরানো হোক, ভয়ের পরিবেশ কাটুক।” তিনি আরও বলেন, শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিরাপত্তা নিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ফল ঘোষণার পর অনেকের রাজনৈতিক অবস্থান বদলের প্রসঙ্গ তুলে কটাক্ষও করেন তিনি।

ঊষসীর মন্তব্য, “শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীরা দলে দলে পাল্টি খাচ্ছেন। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত পুরোদমে যাঁরা আগের সরকারের প্রচার করেছেন তাঁরাই এখন মিন মিন করে পাল্টির গান গাইছেন।” শেষে তিনি বলেন, “বছরের পর বছর জামার রং না পালটেও যাঁরা বেঁচে থাকতে ভালবাসেন, তাঁদের জন্য টলিউডে টিকে থাকা সহজ হোক সেটাই কাম্য।” অন্যদিকে প্রবীণ অভিনেতা চন্দন সেন সতর্ক সুরে বলেন, “এই মুহূর্তে মোদি সরকারের অন্যান্য রাজ্যের ট্র্যাক রেকর্ড দেখলে আশা করার প্রশ্নই জাগে না। আসল চেহারাটা তো বোঝা যাবে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর।” তাঁর মতে, আগামী ছয় মাসেই নতুন সরকারের প্রকৃত ছবি স্পষ্ট হবে।

You cannot copy content of this page