বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই টলিউডের পরিবেশ বদলানো নিয়ে একাধিকবার কথা বলেছেন বিজেপি বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে চলা সমস্যা, অশান্তি এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটাতে নতুন সরকার উদ্যোগ নিতে চায়। সেই বার্তারই বাস্তব ছবি দেখা গেল বুধবার সন্ধ্যায় টেকনিশিয়ান স্টুডিওর বিশেষ বৈঠকে। বহুদিন ধরে টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে প্রযোজক ও পরিচালকদের যে সংঘাত চলছিল, সেই দুই পক্ষকে একসঙ্গে বসিয়ে আলোচনার পথে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন রুদ্রনীল। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অনেকের। বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল টলিউডে কাজের পরিবেশ স্বাভাবিক করা এবং ভবিষ্যতে যাতে শুটিং বা কাজের ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা।
এই বৈঠকেই রুদ্রনীলের পাশে বসে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন অভিনেতা ও পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আমি যে অধিকারে এখানে বসে কথা বলছি, আমার প্রাথমিক ধারণা, রুদ্র আর আমার ২৫ বছরের বন্ধুত্বের জন্য।” একই সঙ্গে তিনি জানান, তাঁদের মধ্যে মতের অমিল বহুদিনের হলেও কখনও ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর তার প্রভাব পড়তে দেননি। পরমব্রতের কথায়, “রুদ্র ও আমার বন্ধুত্বের মধ্যে, যতটা বেশি বন্ধুত্ব রয়েছে, তার থেকে বেশি মতপার্থক্য রয়েছে। সেই মতপ্রার্থক্য কখনও ব্যক্তিগত, কখনও রাজনৈতিকও। কিন্তু আমরা এই বন্ধুত্বের মধ্যে কখনও রাজনীতি আসতে দিইনি।”
তিনি মনে করেন, টলিউডের সব মানুষের ক্ষেত্রেও একই মনোভাব থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে সবার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত তাঁরা সিনেমা জগতের মানুষ এবং কাজটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরমব্রত আরও বলেন, সিনেমা জগতের পরিবর্তন বা সমস্যা সবচেয়ে ভাল বোঝেন শিল্পী, কলাকুশলী, পরিচালক, প্রযোজক বা ডিস্ট্রিবিউটাররাই। তাই শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে কোনও সংগঠনের মাথায় কাউকে বসিয়ে দিলে সমস্যা আরও বাড়বে বলেই তাঁর মত। তিনি বলেন, “এই যে অনেকেই বলছেন, যে ২০১১ এর আগে আমরা খুব আনন্দে কাজ করতাম, তা আমিও স্বীকার করি। এই পরিবেশ আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।”
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে রাজনৈতিক মত আলাদা হলেও কাজের ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়া উচিত নয়। তাঁর কথায়, “এখানে কেউ জয় বাংলা বলবেন, কেউ জয় শ্রীরাম বলবেন, কেউ বন্দে মাতরম বলবেন, কেউ লাল সেলাম বলবেন। কিন্তু সিনেমার কাজের সময় সেটা গুরুত্ব পাবে না।” এই মন্তব্য ঘিরেই বৈঠকে উপস্থিত অনেকের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। টলিউডের সাম্প্রতিক অশান্তির প্রসঙ্গ তুলেও এদিন মুখ খোলেন পরমব্রত। তিনি বলেন, ২০২৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত নন মেম্বারদের নিয়ে কাজ করার বিষয়টি ঘিরে বড় বিরোধ তৈরি হয়েছিল এবং সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন তিনি নিজেও।
তাঁর দাবি, বারবার প্রাক্তন মন্ত্রীদের কাছে ফেডারেশন ও টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে বৈঠকে বসার আবেদন করা হলেও সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। উল্টে পরিচালকদের কাজ শুরু করতে গেলে অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে। পরমব্রত বলেন, “সেই কারণেই আমরা বাধ্য হই আদালতে যেতে।” তিনি আরও জানান, আদালতে যাওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধে ভুল বার্তা ছড়ানো হয়েছিল যে তাঁরা নাকি ফেডারেশন ভাঙতে চাইছেন। তাঁর কথায়, “ফেডারেশনটা আমাদেরও। আমরাও সদস্য।” এরপরই তিনি বিস্ফোরক দাবি করে জানান, মামলায় জড়ানোর পর তাঁকে অলিখিতভাবে কাজ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ‘আমার বাড়িতে হাম’লা হতে পারে বলেই খবর’ বিজেপি সমর্থক অভিনেত্রীর দাবি ঘিরে ফের চর্চায় ‘তৃণমূলী স’ন্ত্রাত’ সমীকরণ! বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেই টার্গে’ট করা হয় টলিউড তারকাদের? নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ থেকে একের পর এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুললেন মাফিন চক্রবর্তী!
সেই সময় তাঁর পরিবারে নতুন সদস্য আসে এবং ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তাঁকে আপস করতে হয়েছিল। আবেগঘন গলায় পরমব্রত বলেন, “দাঁতে দাঁত চেপে আমি ক্ষমা চেয়েছি ছেলের মুখে দিকে তাকিয়ে।” এদিনের বৈঠকে গিল্ডের সদস্যরা স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগও জানান রুদ্রনীল ঘোষকে। সব অভিযোগ শোনার পর রুদ্রনীল বলেন, “আমরা চারজন দায়িত্ব পেয়েছি সবার অসুবিধা শোনার জন্য। যথা জায়গায় আপনাদের মতামত পৌঁছে দেব।” তিনি স্পষ্ট করেন, রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হলেও সবার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত টলিউডের মানুষ হিসেবে।
তাঁর কথায়, “কোনমতে শুটিং বন্ধ যেন না থাকে, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যা মেটাতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি জানান, তাঁরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় নেই, তবে সব সমস্যা সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছে দেবেন। রুদ্রনীল আরও বলেন, “আপনারা সমস্যা এবার লিখিত দিন। আগামী মাসে যেন নির্দিষ্ট নিয়মে ভোট হয় ফেডারেশনের। সেই কথা সাজেস্ট করব উপর মহলে।” বৈঠকের পর টলিউডে দীর্ঘদিনের অশান্তি মেটানোর বিষয়ে নতুন আশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকেই।






