সরকার পালাবদলের পর বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে নতুন করে তৈরি হয়েছে নানা সমীকরণ। বিশেষ করে টলিউডের একাংশ শিল্পীদের অবস্থান নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁদের অনেককেই এখন আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ভিন্ন সুরে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। সেই তালিকায় সাম্প্রতিক সময়ে নাম জড়িয়েছে অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়-এরও। এই পরিস্থিতিতেই অভিনেতার সাম্প্রতিক অবস্থান ও বক্তব্য নিয়ে সরব হলেন বিজেপি নেত্রী তথা অভিনেত্রী লকেট চ্যাটার্জি।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেছেন, একসময় বিজেপিকে ‘অচ্ছুত’ মনে করা হতো এবং সেই সময় বহু শিল্পী দূরত্ব বজায় রাখলেও এখন পরিস্থিতি বদলাতেই অনেকেই নিজেদের অবস্থান পাল্টানোর চেষ্টা করছেন। লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেন, তিনি যখন ২০১৫ সালে বিজেপিতে যোগ দেন, তখন ইন্ডাস্ট্রির বহু মানুষ তাঁকে এবং বিজেপিকে আলাদা চোখে দেখতেন। তাঁর কথায়, সেই সময় বিজেপিতে যোগ দেওয়া মানেই অনেকের কাছে ছিল ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘মাথা খারাপ’ সিদ্ধান্ত নেওয়া। এর জেরে কাজের ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ সময় ধরে অনেক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত থাকতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এমনকি বিভিন্ন বিতর্ক ও অপমানের মুখে পড়লেও খুব কম মানুষই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। লকেটের কথায়, প্রেস কনফারেন্স করেছেন, প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করেছেন, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির অধিকাংশ শিল্পী তখন নীরব ছিলেন। শুধুমাত্র হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু ছাড়া কেউ পাশে দাঁড়াননি বলেই তাঁর অভিযোগ। বিজেপি নেত্রীর দাবি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এখন বহু শিল্পী বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন। তাঁর মতে, আগে যারা বিজেপিকে দূরে সরিয়ে রাখতেন, এখন তাঁরাই বিভিন্নভাবে বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন।
লকেট বলেন, বর্তমানে বিজেপির একাধিক বিধায়ক ও জনপ্রতিনিধি রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই শিল্পী মহল থেকে উঠে এসেছেন। ফলে এখন অনেকেই নিজেদের ‘মুখ দেখানোর’ চেষ্টা করছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, কেউ কেউ এখন সংসার, সন্তান বা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা সামনে এনে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অতীতে বিজেপিকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করার পর এত দ্রুত অবস্থান বদল সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নাও নিতে পারেন বলেই তাঁর মত। স্বাভাবিকভাবেই লকেটের কথায় বোঝাই যায় তিনি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কেই নিশানা করেছেন।
তাছাড়াও সরাসরি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য প্রসঙ্গেও কড়া প্রতিক্রিয়া দেন লকেট তিনি বলেন, একজন শিল্পী হিসেবে মানুষের কাছে তাঁদের একটা আলাদা দায়িত্ব থাকে। সাধারণ মানুষ শিল্পীদের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং তাঁদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেন। সেই কারণে বারবার অবস্থান বদল করলে শিল্পীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয় বলেই মন্তব্য তাঁর। লকেটের কথায়, “এত তাড়াতাড়ি রং বদলানোর কোনও মানে হয় না। নিজেদের সম্মান বজায় রাখুন, শিরদাঁড়া ভেঙে ফেললে মানুষ চিনবে কী করে?” তিনি আরও বলেন, বিজেপি এমন কোনও দল নয় যারা তৃণমূলের মতো কাউকে সঙ্গে সঙ্গে বাদ দিয়ে দেয়। তাই কেউ যদি মত বদলাতেই চান, তাহলে সময় নিয়ে এবং আত্মসম্মান বজায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে তাঁর মত।
আরও পড়ুনঃ “টেবিলটা কি এবার উল্টে গেল?” “বিগত সরকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আমি, বেশ ভয়ে আছি…” কর্মসূত্রে অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপ, স্বরূপের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই! নতুন সরকার আসতেই পাল্টি খেলেন নাকি অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়?
একই সঙ্গে তিনি বিজেপির নেতাকর্মীদেরও সতর্ক থাকার বার্তা দেন যাতে আবেগের বশে কাউকে সহজে গ্রহণ না করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় পরমব্রতকে ঘিরে যে বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও মুখ খোলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, বিজেপিতে থাকার কারণে অতীতে তাঁরা নিজেরাও অসংখ্য কটূক্তি ও অপমান সহ্য করেছেন। কিন্তু সেই সময় তাঁরা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য সমালোচনা আসতেই পারে, কিন্তু শুধুমাত্র চাপের মুখে পড়ে দ্রুত অবস্থান বদলে ফেলা উচিত নয়। শিল্পীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে লকেট বলেন, মানুষ সবকিছু লক্ষ্য করছেন এবং শিল্পীদের সম্মান অনেকাংশেই নির্ভর করে তাঁদের ধারাবাহিকতা ও ব্যক্তিত্বের উপর। ফলে বর্তমান বিতর্কে তাঁর বার্তা স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান বদলানোর আগে শিল্পীদের আরও সতর্ক ও সংযত হওয়া উচিত।






