পর্দার সামনে যাঁদের দেখে দর্শক হেসে ওঠেন, যাঁদের সংলাপ বা অভিনয়ে মুহূর্তের মধ্যে মন ভাল হয়ে যায়, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প কিন্তু অনেক সময়ই থাকে গভীর কষ্ট, লড়াই আর না-পাওয়ার ইতিহাসে ভরা। কমেডিয়ানদের জীবনকে বাইরে থেকে যতটা সহজ আর আনন্দময় মনে হয়, বাস্তবে তার অনেকটাই উল্টো। দিনের শেষে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে সংসারের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, শোক, অসুস্থতা আর অবহেলার দীর্ঘ অধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রের এমনই এক উজ্জ্বল নাম ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা জহর রায়। যিনি পর্দায় মানুষকে হেসে লুটোপাটি করলেও নিজের জীবনে বয়ে বেড়িয়েছেন অসংখ্য যন্ত্রণা। তবুও অভিনয়কে কখনও ছেড়ে যাননি। তাই আজও টিভির পর্দায় তাঁর মুখ ভেসে উঠলে রিমোটের বোতাম থমকে যায় বাঙালির হাতে।
১৯১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বরিশালে জন্ম জহর রায়ের। বাবা সতু রায় ছিলেন নির্বাক যুগের জনপ্রিয় অভিনেতা। তবে বাবার পরিচয় থাকলেও অভিনয় জীবনের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না তাঁর। ছোটবেলার একটা বড় সময় কেটেছে পাটনায়। সেখানেই পড়াশোনা, সেখানেই প্রথম অ্যামেচার থিয়েটারে অভিনয়ের হাতেখড়ি। সেই সময় থেকেই তিনি গুরু মেনেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত কমেডিয়ান চার্লি চ্যাপলিন (Charlie Chaplin)-কে। চ্যাপলিনের শরীরী ভাষা, কমেডির ধরন আর সাধারণ মানুষের জীবনের হাসি-কান্নাকে যেভাবে তিনি পর্দায় তুলে ধরতেন, তা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল জহর রায়কে। সংসারের চাপে কলেজের পড়া শেষ করতে পারেননি। কখনও প্রুফ রিডার, কখনও মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, আবার কখনও দর্জির দোকান চালিয়ে জীবন কাটানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অভিনয়ের টান তাঁকে বারবার টেনে এনেছে ক্যামেরার সামনে।
শেষ পর্যন্ত কলকাতায় এসে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। পরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে সিনেমায় সুযোগ পান জহর রায়। ‘সাহারা’, ‘অঞ্জনগড়’, ‘বসু পরিবার’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করলেও প্রকৃত জনপ্রিয়তা আসে উত্তম-সুচিত্রার কালজয়ী ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর মাধ্যমে। সেই ছবিতেই তাঁর সঙ্গে জুটি বাঁধেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর বাংলা সিনেমায় তৈরি হয় এক ঐতিহাসিক কমেডি জুটি ভানু-জহর। তাঁদের উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের অট্টহাসি। ‘ভানু পেলো লটারি’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘এ জহর সে জহর নয়’-এর মতো ছবিগুলো আজও বাঙালির নস্টালজিয়ার অংশ। শুধু কমেডিই নয়, জহর রায় অভিনয় করেছেন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক কিংবা তরুণ মজুমদারের মতো পরিচালকদের ছবিতেও। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘পরশ পাথর’, ‘নিশিপদ্ম’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে অমলিন।
তবে সাফল্যের আড়ালেও ব্যক্তিগত জীবনে সুখ খুব বেশি ছিল না জহর রায়ের। স্ত্রী কমলা রায়ের হাতের রান্না ছাড়া তিনি খেতেন না, জীবনে কোনওদিন বিলাসিতা করেননি, নিজের বাড়িও তৈরি করেননি। ভাড়া বাড়ি আর মেসবাড়িতেই কেটেছে জীবন। বই পড়ার প্রতি ছিল গভীর নেশা। কলেজ স্ট্রিটের কাছে তাঁর মেসবাড়িতে তৈরি হয়েছিল বড়সড় লাইব্রেরি। কিন্তু একের পর এক ব্যক্তিগত শোক তাঁকে ভিতর থেকে ভেঙে দিতে শুরু করে। তাঁর এক কন্যা জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন ছিল। বহু চিকিৎসা, অপারেশন করেও মেয়েকে বাঁচানো যায়নি। সেই শোক তিনি কোনওদিন কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়েই ‘পিতাপুত্র’ ছবির শুটিং বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। পরে মায়ের মৃত্যু তাঁকে আরও ভেঙে দেয়। কাছের মানুষদের হারানোর কষ্ট ভুলতেই ধীরে ধীরে মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়েন জহর রায়।
একটা সময় এমন হয়েছিল, প্রতিদিন পান্তুয়া দিয়ে মদ খাওয়া ছিল তাঁর অভ্যাস। অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মদ্যপান আর মানসিক অবসাদ ধীরে ধীরে তাঁর শরীরকে শেষ করে দিতে শুরু করে। সুগার, লিভারের সমস্যা, বারবার জন্ডিস সব মিলিয়ে ক্রমশ রোগা ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। শেষ জীবনে তাঁকে দেখে অনেকেই চিনতে পারতেন না। অথচ সেই অবস্থাতেও অভিনয় চালিয়ে গিয়েছেন। ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছিল তাঁর শেষ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। মঞ্চেও নিয়মিত অভিনয় করতেন তিনি। দর্শক তখনও তাঁর অভিনয়ে হাততালি দিতেন, কিন্তু কাছের মানুষরা বুঝতে পারতেন ভিতরে ভিতরে কতটা ভেঙে গিয়েছেন এই অভিনেতা।
আরও পড়ুনঃ উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাঁপিয়েছিলেন বাংলা সিনেমার পর্দা, বলিউড থেকেও এসেছিল ডাক! তবুও জীবনের শেষবেলায় নিঃশব্দে অন্ধকারেই হারিয়ে যান, স্বর্ণযুগের অভিনেত্রী সবিতা চ্যাটার্জি! একের পর এক কালজয়ী ছবি উপহার দেওয়ার পরেও কেন অধরাই থেকে গেল তাঁর প্রাপ্য সম্মান?
১৯৭৭ সালের ১১ অগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জহর রায়। অথচ বাংলার এই অসাধারণ শিল্পীর শেষযাত্রা ছিল প্রায় নিঃশব্দ। টলিউডের অনেকেই সেদিন পাশে দাঁড়াননি। কিন্তু এক মানুষ এসেছিলেন সমস্ত স্টারডম ভুলে সুচিত্রা সেন। মেডিক্যাল কলেজ থেকে যখন জহর রায়ের শেষযাত্রা বেরোচ্ছে, তখন গাড়ি থামিয়ে নেমে আসেন তিনি। ধীর পায়ে উঠে যান জহর রায়ের নিথর দেহের কাছে। তারপর কপালে চুমু এঁকে বলেন, “তুমি চলে গেলে চার্লি!” সেই দৃশ্য আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আবেগের এক অমলিন মুহূর্ত হয়ে রয়েছে। জহর রায় শুধু একজন কমেডিয়ান ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী যিনি নিজের চোখের জল লুকিয়ে আজীবন মানুষকে হাসিয়ে গিয়েছেন।






