বিনোদন জগতের আলোঝলমলে পর্দার আড়ালে এমন অনেক মানুষ থাকেন, যাঁরা অভিনেতা বা অভিনেত্রী নন, তবুও তাঁদের অবদান ছাড়া গ্ল্যামার দুনিয়ার ছবি কখনও সম্পূর্ণ হয় না। মেকআপ আর্টিস্ট, কস্টিউম ডিজাইনার, স্টাইলিস্ট, কোরিওগ্রাফার কিংবা ফটোগ্রাফার প্রত্যেকেই নিজেদের দক্ষতা দিয়ে তারকাদের সাফল্যের অংশ হয়ে ওঠেন। দর্শকরা তাঁদের মুখ হয়তো সবসময় দেখেন না, কিন্তু তাঁদের কাজের ছাপ থেকে যায় বহুদিন। টলিউডের এমনই এক পরিচিত নাম ছিলেন সন্দীপ ঘোষাল, যিনি ‘স্যান্ডি’ নামেই বেশি জনপ্রিয়। একসময় বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের বহু তারকার ভরসার নাম ছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের এক কঠিন মোড়ে এসে সেই পরিচিত মুখকেই লড়াই করতে হয়েছে অস্তিত্বের সঙ্গে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রেন টিবি এবং মৃগী রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন সন্দীপ। অসুস্থতা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে তাঁর মস্তিষ্কের একাধিক কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তিনি ভুলে যেতে শুরু করেন নিজের অতীত, নিজের কাজ, এমনকি জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও। একসময় যিনি তারকাদের সাজিয়ে তুলতেন, তিনি নিজেই হয়ে পড়েন অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। ঘন ঘন শারীরিক অসুস্থতা, বমি ভাব, মৃগীর সমস্যা এবং স্মৃতিভ্রংশ সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক অনিশ্চিত অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। সেই সময় টলিউডের একাধিক তারকা ও শুভানুধ্যায়ী তাঁর পাশে দাঁড়ান। বিশেষ করে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র ও বিয়াস রায় তাঁর চিকিৎসা এবং সুস্থতার জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন।
তবে দীর্ঘ সংগ্রামের পর এবার এসেছে কিছুটা স্বস্তির খবর। বর্তমানে সন্দীপের শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই ভালো। তিনি এখন অনেক বেশি প্রাণবন্ত, স্বাভাবিক জীবনযাপনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন। আগে যেখানে সাধারণ দৈনন্দিন কাজ নিয়েও সমস্যা ছিল, এখন তিনি নিয়মিত চুল, দাড়ি ও নখ কাটতে দিচ্ছেন। স্নান করতেও আর আপত্তি করেন না। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন বজায় রাখার চেষ্টা চলছে, কারণ সেটাই তাঁর সুস্থতার পথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দীর্ঘদিন পর তাঁর এই পরিবর্তন পরিবার ও কাছের মানুষদের মুখে ফিরিয়ে এনেছে স্বস্তির হাসি।
কিন্তু এই স্বস্তির মধ্যেও রয়ে গেছে এক গভীর বেদনা। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর মস্তিষ্কের যে স্মৃতিবাহী কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলি আর আগের অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। বর্তমানে তিনি শর্ট টার্ম মেমরি লসের সমস্যায় ভুগছেন। অর্থাৎ সাম্প্রতিক অনেক বিষয়ই মনে রাখতে পারেন না। ফলে যে পেশা একসময় তাঁর পরিচয় তৈরি করেছিল, সেই স্টাইলিংয়ের জগতে আর ফেরা সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন চিকিৎসকরা। এই বাস্তবতা নিঃসন্দেহে কষ্টের। কারণ একজন সৃজনশীল মানুষের কাছে নিজের কাজ হারিয়ে ফেলা অনেক সময় নিজের একটা বড় অংশ হারিয়ে ফেলার মতোই।
আরও পড়ুনঃ “একজন শিল্পীকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে…পার্টি করব, আড্ডা মারব, আবার গানও গাইব” নিজের কণ্ঠস্বর বাঁচাতে কঠোর সিদ্ধান্ত ইমন চক্রবর্তীর! গায়িকার কথা শুনে অবাক নেটপাড়া!
তবুও এই গল্প শুধুই হারানোর নয়, এটি ভালোবাসা, লড়াই এবং আশার গল্পও। তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন জানিয়েছেন, সন্দীপ হয়তো আর কোনওদিন কাজের জগতে ফিরতে পারবেন না, কিন্তু তিনি যেন সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাঁর হাত কখনও ছেড়ে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানানো হয়েছে। দীর্ঘ অন্ধকারের পর আজ যে সামান্য আলো দেখা যাচ্ছে, সেটাই তাঁদের কাছে অনেক বড় আশীর্বাদ। আর সেই কারণেই সন্দীপ ঘোষালের এই লড়াই আজ শুধু একজন অসুস্থ মানুষের গল্প নয়, বরং জীবনের প্রতি অটুট বিশ্বাস এবং ভালোবাসার এক আবেগঘন উদাহরণ।






