বাংলা গানের ইতিহাসে সুরকার সলিল চৌধুরীর নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর অসংখ্য সৃষ্টি আজও সমান জনপ্রিয়। তবে তাঁর সাফল্যের নেপথ্যে যাঁরা নীরবে পাশে ছিলেন, তাঁদের কথা খুব কমই আলোচনায় আসে। তেমনই এক নাম জ্যোতি চৌধুরী। তিনি শুধু সলিল চৌধুরীর প্রথম স্ত্রীই ছিলেন না, জীবনের কঠিন সময়ে তাঁর অন্যতম বড় ভরসাও ছিলেন। নিজের স্বপ্ন, পরিবার এবং ভবিষ্যতের কথা না ভেবে স্বামীর সাফল্যের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক টেকেনি। তবুও হার না মেনে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিলেন এই দৃঢ়চেতা নারী।
কলকাতার ভবানীপুরের এক সমৃদ্ধ পরিবারের মেয়ে ছিলেন জ্যোতি। একসময় সলিল চৌধুরীর কাছে দর্শন পড়তেন তিনি। সেই শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্কই ধীরে ধীরে ভালোবাসায় পরিণত হয়। কিন্তু তখনও সঙ্গীত জগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেননি সলিল চৌধুরী। স্থায়ী আয় না থাকায় এই বিয়েতে রাজি ছিল না জ্যোতির পরিবার। তবুও ১৯৫৩ সালে পরিবারের অমতে তাঁরা বিয়ে করেন। এরপর স্বামীর হাত ধরে তৎকালীন বম্বেতে চলে যান জ্যোতি। একটাই লক্ষ্য ছিল, একদিন সলিল চৌধুরীকে প্রতিষ্ঠিত সুরকার হিসেবে দেখতে হবে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের আরাম-আয়েশের কথা কখনও ভাবেননি তিনি।
মুম্বইয়ে প্রথমদিকে সংসার চালানো সহজ ছিল না। সলিল চৌধুরীর আয় খুবই সীমিত ছিল। তখন সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন জ্যোতি। কলকাতার আর্ট কলেজে পড়াশোনা করলেও বিয়ের কারণে তাঁর কোর্স শেষ করা হয়নি। কিন্তু ছবি আঁকার প্রতিভাকে তিনি কখনও হারিয়ে যেতে দেননি। চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রদর্শনীর আয়োজন করে নিজের উপার্জনের পথ তৈরি করেন। ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন এবং নিজের উপার্জনের টাকায় বান্দ্রার পেরি ক্রস রোডে একটি বাড়িও কেনেন। সেই বাড়ির নাম রাখেন “সুরছায়া”। বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের আত্মসম্মান এবং পরিশ্রমকে কখনও বিসর্জন দেননি তিনি।
জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে তখন, যখন সলিল চৌধুরী তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টেনে পরে বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী সবিতা চৌধুরীকে বিয়ে করেন। যে মানুষটির সাফল্যের জন্য জ্যোতি নিজের পরিবার, স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বপ্নের অনেকটাই ত্যাগ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটিই অন্য জীবনের পথে হাঁটেন। কিন্তু এই আঘাতে ভেঙে পড়েননি জ্যোতি। ষাটের দশকে সমাজের নানা বাধা উপেক্ষা করে একাই তিন মেয়ে অলকা, তুলিকা এবং লিপিকাকে বড় করে তোলেন। সেই সময় একজন একক মা হিসেবে সন্তানদের মানুষ করা মোটেই সহজ ছিল না। তবুও তিনি সাহসের সঙ্গে সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং নিজের লড়াই থামতে দেননি।
শুধু সংসার নয়, শিল্পচর্চাও কখনও ছাড়েননি জ্যোতি চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই দাদুকে ছবি আঁকতে দেখে তাঁর শিল্পের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল। পরে সলিল চৌধুরীর উৎসাহেই তিনি আর্ট কলেজে ভর্তি হন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার দাদু ঈশ্বরের ছবি আঁকতেন।” আবার সলিলের প্রসঙ্গে তাঁর কথায়, “আমার দাদার বন্ধু ছিলেন উনি। পরে আমাকে পড়াতে আসতেন। উনিই কলেজে ভর্তি করেছিলেন।” তিনি আরও গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, “আমি সরাসরি সেকেন্ড ইয়ারে ভর্তি হয়েছিলাম।” যদিও বিয়ের কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি, তবুও রং-তুলির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনও দিন ছিন্ন হয়নি।
আরও পড়ুনঃ সঞ্চালক বদল হতেই বড় ধাক্কা? রচনার বিদায়ে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়! হাল ধরেছেন স্বস্তিকা, এক মাস যেতে না যেতেই ‘দিদি নম্বর ১’ হতে চলেছে বন্ধ? একই হাল ‘দাদাগিরি’রও! টলিপাড়ায় চাঞ্চল্য, সামনে এল কোন সম্ভাব্য কারণ?
জীবনের শেষ পর্বে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকলেও আঁকাআঁকি ছাড়েননি জ্যোতি চৌধুরী। শেষ দিন পর্যন্ত শিল্পই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক আঘাত, সম্পর্ক ভাঙার কষ্ট, একা হাতে সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রাম এবং নিজের পরিচয় গড়ে তোলার লড়াই সব মিলিয়ে তাঁর জীবন আজও অনুপ্রেরণার উদাহরণ। তিনি হয়তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন না, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতি ও শিল্পের ইতিহাসে তাঁর আত্মত্যাগ, সাহস এবং আত্মসম্মানের গল্প আজও সমানভাবে স্মরণীয়।






