রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে আবারও চর্চার কেন্দ্রে গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তী। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ শিল্পী বলে আক্রমণ করে আসছেন বিরোধীরা। বিশেষ করে একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাজ্যে তৃণমূলের বড় ধাক্কার পর প্রথম বড় সাক্ষাৎকারে নচিকেতা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং কখনও ছিলেনও না। তাঁর কথায়, “আমি তৃণমূল নই, কোনওদিনই নই। যদি সত্যিই চটি চেটে থাকি, তার প্রমাণ কোথায়?” একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ক্ষমতা আসে যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলি থেকে যায়। তাই রাজনীতির পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
সম্প্রতি দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে নচিকেতা বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রাজনৈতিক নয়, বরং ভাই-বোনের মতো। বহু বছর আগে তিনি যে মন্তব্য করেছিলেন “লেনিনকে দেখিনি, মমতার মধ্যে লেনিনকে দেখেছি” সেই বক্তব্য থেকেও তিনি আজ সরে আসছেন না। তাঁর দাবি, তিনি ব্যক্তিগতভাবে একজন মার্ক্সবাদী এবং লেনিনের আদর্শে বিশ্বাসী। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে মানুষের প্রতি যে ভালোবাসা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রবণতা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ওই মন্তব্য করেছিলেন। নচিকেতার কথায়, “আমি ওনাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। মানুষের জন্য ওনার আবেগ আমি প্রত্যক্ষ করেছি। সেই কারণেই ওই কথা বলেছিলাম, এখনও বলছি।”
একইসঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও। নচিকেতার দাবি, তিনি কখনও ভোটে দাঁড়াতে চাননি, যদিও একাধিকবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে প্রস্তাব এসেছিল। এমনকি একবার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে তিনি মুম্বই চলে গিয়েছিলেন বলেও জানান। তাঁর বক্তব্য, তিনি গান গেয়ে জীবন কাটাতে চান, রাজনীতি করে নয়। তিনি আরও বলেন, “আমার কোনও কমিটি নেই, কোনও পদ নেই, কিছু পাওয়ার লোভও নেই।” রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে নিজেকে তিনি একজন শিল্পী হিসেবেই দেখতে চান। তাই তাঁকে ঘিরে ‘চটিচাটা’ বা রাজনৈতিক সুবিধাভোগীর তকমা লাগানোকে তিনি অন্যায় বলেই মনে করেন।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের প্রসঙ্গও। অনেকের কাছেই অবাক করার মতোভাবে নচিকেতা জানান, দিলীপ ঘোষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। শুধু তাই নয়, সুস্থ থাকার নানা পরামর্শও তিনি নিয়মিত পান দিলীপ ঘোষের কাছ থেকে। নচিকেতার কথায়, “দিলীপ ঘোষের সঙ্গে আমার খুব ভালো কথাবার্তা আছে। উনি আমাকে বলেন কীভাবে হাঁটতে হবে, কীভাবে সুস্থ থাকতে হবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো থাকতেই পারে। একজন শিল্পীর কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রং থাকা উচিত নয় বলেও তাঁর মত। “আমার কোনও রং নেই, কোনও জাত নেই। আমি শুধু ভালোবাসা চাই,” বলেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ “৬৯ গ্রামের ওই সোনার হার ও মানতাসা ফেরত না দিলে এবার ডোমেস্টিক ভায়ো’লেন্সের কেস করব!” প্রবাহকে হুঁশিয়ারি দেবলীনা নন্দীর! বিয়েতে শ্বশুরবাড়ির তরফ থেকে দেওয়া গয়না ফেরত না পাওয়ার অভিযোগে আইনি পদক্ষেপের পথে ভাইরাল গায়িকা!
রাজনীতি, ক্ষমতা এবং সমাজ নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে এই সাক্ষাৎকারে। ‘কাটমানি’ গান থেকে শুরু করে ‘আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ’ একাধিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক গানের প্রসঙ্গ টেনে নচিকেতা বলেন, তিনি আসলে সমাজের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং প্রশ্নগুলোকেই গানের ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, রাজনীতিতে আদর্শের জায়গা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে এবং দলবদল এখন অনেক ক্ষেত্রেই পেশা বা ব্যবসার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে নতুন সরকারের প্রতি তাঁর কোনও ক্ষোভ নেই। বরং তিনি অপেক্ষা করছেন নতুন প্রশাসন তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করে তা দেখার জন্য। সাক্ষাৎকারের শেষে নিজের বিখ্যাত গান ‘রাজা আসে রাজা যায়, সিংহাসন একই থাকে’-র কয়েকটি লাইন গেয়ে তিনি যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজের মূল প্রশ্নগুলি একই থেকে যায়।






