মাদকাসক্তি শুধুমাত্র একটি খারাপ অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি জটিল রোগ এই বার্তাই আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী দিবসে সামনে আনলেন অভিনেতা অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নেশা মানুষের শরীর ও মনের উপর এমন প্রভাব ফেলে যে ধীরে ধীরে নিজের জীবন, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সে। তাঁর মতে, আসক্তির মূল চালিকাশক্তি হল ‘উইথড্রয়াল’ বা নেশা না পেলে মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতা, যা একজন মানুষকে বারবার একই ভুলের দিকে ঠেলে দেয়।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজসচেতন নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তবে খুব কম মানুষই জানতেন, তাঁর জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অল্প বয়সেই নেশার জগতে প্রবেশ করেছিলেন। প্রথমদিকে বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দেননি, বরং মনে করেছিলেন সবকিছু তাঁর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, আসক্তি আসলে এমন এক রোগ, যা একজন মানুষকে নিজের অজান্তেই গ্রাস করে ফেলে।
নিজের অতীতের কথা বলতে গিয়ে অনিন্দ্য জানান, তিনি ব্রাউন সুগারের মতো কঠিন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময়ে একাধিকবার রিহ্যাবে যেতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু রিহ্যাবে চিকিৎসা নেওয়ার পরেও বারবার ‘রিল্যাপস’ বা পুনরায় নেশায় ফিরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, “আমি এমন একজন মানুষ ছিলাম, যে বারবার পড়ে গিয়েও আবার উঠতে চেষ্টা করেছে।” তাঁর কথায়, রিহ্যাবে থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল, কারণ সেখানে চিকিৎসা, নিয়ম এবং সহায়তার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু লকআপ ও জেলের অভিজ্ঞতা ছিল অনেক বেশি কঠিন ও মানসিকভাবে কষ্টদায়ক। তিনি স্বীকার করেন, নেশার কারণে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা কোনওদিন কল্পনাও করেননি।
অভিনেতার কথায়, দীর্ঘদিন মাদক ব্যবহারের ফলে শরীর রাসায়নিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন শুধুমাত্র শারীরিক কষ্ট নয়, ভিতর থেকে এক ধরনের শূন্যতা ও অস্থিরতা কাজ করে। সেই সময় নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় মনে হত। তিনি বলেন, জীবনের একেবারে তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সবাই দেখেছেন তাঁর ভেঙে পড়া অবস্থা। তবে সেই কঠিন সময়ই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, যদি পরিবর্তন না আনেন, তাহলে সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় বিপর্যয় হয় মানসিক ভারসাম্য হারানো, নয়তো জেল বা মৃত্যুর মতো পরিণতি। সেই উপলব্ধিই তাঁকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।
আরও পড়ুনঃ ‘চিরুনি পর্যন্ত ছোঁয়াতে পারি না…’ প্রচণ্ড মা’র খেয়ে ব্রেন হ্যা’মারেজ, আজও মাথায় র’ক্ত জমাট বাঁধে! বহু বছরের লম্বা চুল কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন, কী এমন ঘটেছিল যে য’ন্ত্রণা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়? জানালেন সেই অজানা কারণ!
বর্তমানে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নেশামুক্ত জীবন কাটাচ্ছেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। তিনি মনে করেন, কোনও মানুষ একা এই লড়াই জিততে পারে না; পরিবার, বন্ধু এবং পেশাদার সাহায্য অত্যন্ত জরুরি। পশ্চিমবঙ্গে রিহ্যাব পরিষেবার নানা সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি সরকারের কাছে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ, লাইসেন্সিং ও তদারকির দাবি জানান। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “সাহায্য চাইতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আসক্তি একটি রোগ, আর রোগের চিকিৎসা প্রয়োজন।” নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাঁর গল্প হয়তো এমন অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাবে, যারা এখনও নেশার অন্ধকারে হারিয়ে গিয়ে মুক্তির পথ খুঁজছেন।






