বাংলা বিনোদন জগতের তারকাদের ঝলমলে জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না-বলা গল্প। পর্দায় যাঁদের হাসতে, প্রেম করতে কিংবা নায়কোচিত চরিত্রে দেখা যায়, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনেও থাকে সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিচ্ছেদ এবং নানা সংগ্রামের অধ্যায়। জনপ্রিয় অভিনেতা জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনও ছিল ঠিক তেমনই এক গল্পে ভরা। অভিনয়জীবনের সাফল্য, প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ এবং জীবনের শেষ অধ্যায়—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। প্রখ্যাত বাঙালি অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি জয় ব্যানার্জী নামেও পরিচিত, ২৫ আগস্ট ২০২৫ সালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। ১৫ আগস্ট গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা তাঁকে ভেন্টিলেটরে রাখেন। অবশেষে ২৫ আগস্ট সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে ৬৩ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ‘মিলন তিথি’, ‘হীরাক জয়ন্তী’ ও ‘চপার’-এর মতো একাধিক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন এবং ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
পরে ২০২১ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন। জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও বিবাহ। ২০০০ সালে মিস ক্যালকাটা প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে ছিলেন জয়। সেই প্রতিযোগিতাতেই অংশগ্রহণ করেছিলেন অনন্যা। প্রথম দেখাতেই অনন্যাকে ভালো লেগে যায় জয়ের। পরে তিনি অনন্যাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন এবং সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান অনন্যাও। তবে বিয়ের পথে প্রথম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জয়ের বাবা। তিনি প্রথমে এই সম্পর্ক মেনে নিতে চাননি। কিন্তু অনন্যার সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর মন বদলে যায়। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয় জয় ও অনন্যার।
ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন মিলিয়ে প্রায় ৫০ জন অতিথির উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় তাঁদের বিয়ে। বিয়ের পর বেশ কয়েক বছর সুখেই কাটছিল তাঁদের সংসার। যদিও তাঁদের কোনও সন্তান ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। ২০১০ সালে অনন্যা তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। অন্যদিকে ২০১৪ সালে জয় বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিতে যোগ দেন। দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের পক্ষে একই ছাদের তলায় থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে জয় নিজেই জানিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক মতবিরোধই তাঁদের আলাদা হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
আরও পড়ুনঃ হঠাৎ অসহ্য যন্ত্র’ণা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন পাপিয়া অধিকারী! আর একটু দেরি হলেই হতে পারত বড় বিপদ, তড়িঘড়ি করতে হয়েছে অ’স্ত্রোপচার! কী ঘটেছে বিজেপি বিধায়ক তথা অভিনেত্রীর সঙ্গে? এখন কেমন আছেন তিনি?
তবে বিচ্ছেদের পরেও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি তাঁদের সম্পর্কের মানবিক বন্ধন। দীর্ঘ প্রায় এক দশক যোগাযোগ না থাকলেও ২০২১ সালে জয় রাজনীতি থেকে সরে আসার পর আবার তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়। জয়ের অসুস্থতার সময়ও অনন্যা তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী অঙ্কিতার সঙ্গেও অনন্যার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাই জয়ের মৃত্যুর পর তাঁর শেষযাত্রায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চোখের জলে বিদায় জানান প্রাক্তন স্ত্রী অনন্যা ও বর্তমান স্ত্রী অঙ্কিতা। অনন্যা বলেন, “ও আমার জীবনের প্রথম পুরুষ, প্রথম প্রেম। সারাজীবন ও আমার মনে থেকে যাবে।” জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শুধু বাংলা চলচ্চিত্র জগতই নয়, তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু মানুষের মনেও এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে।






