শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের অন্যতম জনপ্রিয় গায়িকা ‘কৌশিকী চক্রবর্তী’ (Kaushiki Chakraborty) আজ শুধু দেশের নয়, বিদেশের মঞ্চেও সমান জনপ্রিয়। সংগীতের দীর্ঘ সাধনা, অসংখ্য কনসার্ট এবং টেলিভিশনের জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘সারেগামাপা’-র বিচারক হিসেবে তিনি দর্শকদের কাছেও অত্যন্ত পরিচিত মুখ। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সুখী সংসারের অধিকারিণী। ২০০৪ সালে দীর্ঘদিনের বন্ধু ও বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী পার্থসারথী দেশিকানকে বিয়ে করেন কৌশিকী। তাঁদের একমাত্র ছেলে ঋষিও ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের পরিবেশে বড় হয়ে উঠছে। পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবার, বিশেষ করে ছেলেকে ঘিরেই যে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আবেগ, তারই স্পষ্ট ছবি উঠে এল সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে।
সম্প্রতি ‘সারেগামাপা’-র গ্র্যান্ড ফিনালের পর সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন কৌশিকী চক্রবর্তী। একটি দীর্ঘ সফর শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই শোয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ, মায়া এবং বিচ্ছেদের অনুভূতি নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়। সেই প্রসঙ্গ থেকেই নিজের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। গায়িকার কথায়, “একবার যখন আমরা মা হয়ে যাই, তখন আমরা প্রথমে মা তারপর সবকিছু। আজ ১৬ বছর আমি মা হয়েছি…এটা আমার প্রতিদিনের যুদ্ধ। কারণ আমি তো ২৪ ঘণ্টা সঙ্গে আছি, এমন একজন মা নই! ২৪ ঘণ্টা আমি ওর সঙ্গে না থাকলেও আমার ছেলে কিন্তু ২৪ ঘণ্টা আমার সঙ্গেই থাকে। সেই জন্য মায়া বা মমতার মতো আবেগ অনুভূতি ছাড়া তো আমরা মানুষই নই, আবার এই আবেগেরও একটা ভার আছে।
এই ভার নিয়ে চলতে নিজেকে শেখাতে হয়…” কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও জানান, কাজের সূত্রে তাঁকে প্রায়ই দেশের বাইরে যেতে হয়। তবু ছেলেকে ছাড়া থাকার অভ্যাস আজও তাঁর হয়ে ওঠেনি। তাই বিদেশ সফরে বেরোলেও সুটকেসে ছেলের জামা নিয়ে যান। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিদেশে গেলে এখনও সুটকেসে করে ছেলের জামা নিয়ে যাই। ছোটবেলা ডাইপার নিয়ে যেতাম, এখন টিশার্ট নিয়ে যাই, জানি আর কিছুদিন পর ও খুব রাগারাগি করবে। এখনও তাও রাস্তাঘাটে হাত ধরতে দেয়, কদিন পরে বলবে না না হাত ধরার কী আছে? এটাই তো স্বাভাবিক, আর ওটা দেখারও একটা আনন্দ আছে। ও যে ক্রমশ আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে, ওর যে আর সবকিছুতে আমার দরকার পড়ছে না, অথচ ও মাঝেমধ্যে আমায় বেছে নিচ্ছে, এটাই তো আনন্দের!”
আরও পড়ুন: ‘ফাজলামোর একটা সীমা থাকা উচিত!’ ‘গঙ্গার জল এত স্বচ্ছ হলো কবে থেকে?’ ‘কলকাতায় গঙ্গার গভীরতা ১৪৭ মিটার, এরা নীচে গিয়ে দিব্যি হাঁটাহাঁটি করছে, ভোগ নিবেদন করছে!’ ‘গঙ্গা’র নতুন প্রোমো দেখেই হাসির রোল নেটপাড়ায়!
তাঁর এই স্বীকারোক্তিতে একজন ব্যস্ত শিল্পীর পাশাপাশি এক মায়ের সহজ-সরল অনুভূতিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৌশিকীর কথায়, সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের ধরনও বদলে যায়। একসময় যে সন্তান প্রতিটি কাজে মায়ের উপর নির্ভর করত, সে ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে শেখে। একজন মা হিসেবে সেই পরিবর্তন কখনও আবেগের, কখনও গর্বের। তাই ছেলের স্বাধীনভাবে বড় হয়ে ওঠাকে তিনি দুঃখ নয়, বরং আনন্দের সঙ্গেই দেখেন। ব্যস্ত পেশাজীবন, অনুষ্ঠান, রেওয়াজ কিংবা বিচারকের দায়িত্বের মাঝেও ছেলের ছোট ছোট পরিবর্তন, অভ্যাস এবং বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কাছে সমান মূল্যবান বলেই জানান গায়িকা।

সবশেষে কৌশিকী চক্রবর্তী এমন একটি স্মৃতির কথা শোনান, যা আজও তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। তিনি বলেন, “একবার মাদর্স ডে-তে একটা কার্ড লিখেছিল, ‘যদি তুমি আমার মা না হতে, তাহলে বন্ধু হিসেবে বেছে নিতাম।’ এটাই আমার সব থেকে বড় প্রাপ্তি।” গায়িকার এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে মা-ছেলের গভীর বন্ধনের আসল ছবি। সাফল্য, জনপ্রিয়তা কিংবা অসংখ্য সম্মানের মধ্যেও সন্তানের ভালোবাসাকেই তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে মনে করেন।






