বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটির মতোই দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় ছিল উত্তম কুমার এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জুটিও। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে থিয়েটার, বড়পর্দা এবং ছোটপর্দায় নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে তিনি আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। আজও সমান উৎসাহ নিয়ে ক্যামেরার সামনে কাজ করে চলেছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। সম্প্রতি টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি দেওয়া হয়। এই বিশেষ সম্মান গ্রহণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি নিজের জীবনের নানা অজানা স্মৃতি সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জানান, ছোটবেলায় বাংলাদেশে থাকার সময় তাঁর স্বপ্ন ছিল নেতা হওয়ার। তিনি বলেন, “আমি ছোটবেলায় বাংলাদেশে যখন থাকতাম, তখন নেতা হতে চেয়েছিলাম। এক নেতাকে ভাষণ দিতে দেখে নেতা হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল। বাবার একটা গ্রামোফোনের চোঙা নিয়ে ভরদুপুরে ‘পেটে ভাত দেব, কাজ দেব’ বলে হেঁকে বেড়িয়েছি। ফল হিসেবে পাড়ার লোক এসে বাবার কাছে নালিশ করে। বাবাও আমাকে বেশ বকাঝকা করেন। নেতা হওয়া আর হয়নি। তবে কপালে যা ছিল, তাই হয়েছে। নেতা নয়, অভিনেতা হয়ে গিয়েছি। মানুষ যা চায়, তা সবসময় হয় না। আবার না চাইতেও অনেক কিছু হয়ে যায়।” তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত সকলেই মুগ্ধ হন।
ডি.লিট সম্মান পেয়ে তিনি নিজের আনন্দও প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বাবাকে স্মরণ করে আরও একটি আবেগঘন ঘটনার কথা তুলে ধরেন। অভিনেত্রী জানান, তাঁদের পরিবারে কোনও ভাই ছিল না। বাবা ও মা একটি পুত্রসন্তানের আশায় ছিলেন। সেই প্রত্যাশা থেকেই একের পর এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয় এবং তাঁদের পরিবারে মোট দশ বোন। তিনি বলেন, তাঁর দিদিদের কাছ থেকেই তিনি ছোটবেলার এই গল্প শুনেছেন। তাঁর জন্মের সময় বাড়ির সকলে ভেবেছিলেন, এবার হয়তো ছেলে হবে। তাই আনন্দের প্রস্তুতি হিসেবে বাড়িতে মিষ্টি ও শাঁখও রাখা হয়েছিল।
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জানান, সেই সময় তাঁর দিদিরা বাড়ির কাছেই এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জন্মের পর যখন জানা গেল আবারও কন্যাসন্তান হয়েছে, তখন পরিবারের অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “বাড়ির সবাই কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। এদিকে দিদিরা যখন বাড়ির দিকে রওনা হয়, তখন পাড়ার কেউ গিয়ে বলে, ‘বাড়িতে কান্নাকাটি হচ্ছে, তোদের আবার বোন হয়েছে।’ সেই কথা শুনে দিদিরা ভয়ে আর সেদিন বাড়ি ফেরেনি, আত্মীয়ের বাড়িতেই রাত কাটিয়েছিল।” জীবনের সেই পুরনো ঘটনা তিনি হাসিমুখেই সকলকে শুনিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ “হাইজ্যা’ক করার চেষ্টা করেছেন, সমস্যার সৃষ্টি করেছেন, যে কোনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ নিশ্চুপ থাকেন…” নিট আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে শিল্পীদের ভূমিকা, খোলামেলা মত টোটা রায়চৌধুরীর! অভিনেতার জানালেন, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় কী হওয়া উচিত?
শেষে অভিনেত্রী বলেন, “বুঝতেই পারছেন, সবাইকে কাঁদিয়ে আমার এই ধরাধামে আগমন। আগে এই কথা শুনে খুব খারাপ লাগত, তবে আজ আর খারাপ লাগে না।” জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি আজ যে জায়গায় পৌঁছেছেন, সেই পথচলার স্মৃতিও এই অনুষ্ঠানে উঠে আসে তাঁর কথায়। ডি.লিট সম্মানে সম্মানিত হওয়ার আনন্দের পাশাপাশি শৈশবের স্মৃতি, পরিবারকে ঘিরে আবেগ এবং অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প ভাগ করে নিয়ে তিনি উপস্থিত সকলের মন জয় করেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল হাস্যরস, তেমনই ছিল জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ছোঁয়া।






