বিনোদন জগতের তারকাদের জীবনকে বাইরে থেকে যতটা রঙিন এবং আলো ঝলমলে মনে হয়, বাস্তবে তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না বলা গল্প, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সাফল্যের পাশাপাশি গভীর ব্যক্তিগত বেদনা। দর্শকদের মুখে হাসি ফোটাতে কিংবা পর্দায় অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে বছরের পর বছর মন জয় করলেও, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অধ্যায় অনেক সময় সাধারণ মানুষের অজানাই থেকে যায়। এমনই এক আবেগঘন জীবনের গল্প বহন করে চলেছেন টলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা দীপঙ্কর দে। অভিনয় জীবনে তিনি যতটা সফল, ব্যক্তিগত জীবনে তাঁকে পেরোতে হয়েছে বহু কঠিন সময়। টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় এবং চর্চিত জুটিগুলির মধ্যে অন্যতম হল দীপঙ্কর দে ও দোলন রায়।
বয়সের বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের সম্পর্ক দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রায় ২৩ বছর লিভ-ইন সম্পর্কে থাকার পর ২০২০ সালে আইনিভাবে একে অপরের সঙ্গী হন তাঁরা। তবে এই সম্পর্ক নিয়ে নানা সময়ে নানা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, দীপঙ্করের প্রথম সংসার ভেঙে যাওয়ার কারণ ছিলেন দোলন রায়। যদিও সেই অভিযোগ বহুবার অস্বীকার করেছেন অভিনেত্রী নিজে। দীপঙ্কর দের ব্যক্তিগত জীবনের শুরুটা কিন্তু অন্যরকম ছিল। তরুণ বয়সে তিনি দিল্লিতে চাকরি করতেন। সেখানেই এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান তরুণী বান্টি রোজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বান্টি একটি বেসরকারি সংস্থায় রিসেপশনিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব এবং পরে প্রেম। ১৯৬৯ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা সন্তান বৈশালী ও বিশাখার জন্ম হয়। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসারই ছিল অভিনেতার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিনয় জগতে দীপঙ্কর দের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত দু’জনের বিচ্ছেদ ঘটে। তবে স্ত্রী থেকে আলাদা হলেও দুই মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও নষ্ট হয়নি। বরং তিনি বরাবরই তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থেকেছেন। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলির মধ্যে একটি আসে অভিনেতার জীবনে। মাত্র ৫২ বছর বয়সে প্রয়াত হন তাঁর বড় মেয়ে বৈশালী। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই কিডনি ও হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।
হঠাৎ বড়সড় হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মেয়ের মৃত্যু সংবাদে ভেঙে পড়েছিলেন দীপঙ্কর দে। সংবাদমাধ্যমের সামনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তিনি। কাঁপা গলায় জানিয়েছিলেন, তাঁর মেয়েকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একইভাবে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন বৈশালীর মা বান্টি রোজও। বাবা-মা দু’জনের কাছেই এই মৃত্যু ছিল অপূরণীয় ক্ষতি। এই কঠিন সময়েই সামনে আসে দোলন রায়ের মানবিক দিক। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, বৈশালীর মৃত্যুর পর হাসপাতালেই প্রথমবার তাঁর সঙ্গে বান্টি রোজের দেখা হয়। তাঁদের মধ্যে কোনও তিক্ততা ছিল না বলেই জানান অভিনেত্রী।
আরও পড়ুনঃ “বিয়ে মানেই একটা আতঙ্ক…” সাফ জানিয়ে দিলেন উত্তম কুমারের নাতনি নবমিতা চট্টোপাধ্যায়! ভাস্বরের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘিরে উত্তাল হয়েছিল টলিপাড়া, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে কম হয়নি বিতর্ক! তারপর কেন আজও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে ভয় পান তিনি? জানালেন, প্রথম দাম্পত্যের কোন তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে?
তাঁর কথায়, দীপঙ্কর দে ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর বিচ্ছেদের অনেক পরে তিনি অভিনেতার জীবনে এসেছেন। তাই বান্টি রোজের কখনও তাঁর প্রতি ক্ষোভ ছিল না। মেয়েকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়া দুই বয়স্ক বাবা-মায়ের পাশে তিনি সেদিন ছায়ার মতো ছিলেন। তাঁদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে মানসিকভাবে আগলে রাখা সবটাই করেছিলেন তিনি। এই ঘটনাই যেন প্রমাণ করে, সম্পর্কের সমীকরণ যতই জটিল হোক না কেন, মানবিকতা এবং ভালোবাসার জায়গাটা সবসময় সবচেয়ে বড়। দীপঙ্কর দের জীবনের এই অধ্যায় তাই শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়, বরং একজন বাবা, একজন মানুষ এবং এক পরিবারের না বলা আবেগের গল্পও বটে।






