“আমার খারাপ লাগা, অঝোরে ঝরে পড়া চোখের জল শুধু আমার বালিশই জানে” কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম স্ত্রী মনোবীণার ছেলে সুস্নাতকে নিজের সন্তান হিসেবে কোলে তুলে আর কোনওদিন মা হননি লাবনী সরকার! তাঁর এই ত্যাগ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার! কিন্তু মাতৃত্বের অবিশ্বাস্য গল্পের নেপথ্যে লুকিয়ে কোন অজানা মানসিক যন্ত্র’ণার অধ্যায়, ভাগ করলেন অভিনেত্রী?

বাংলা টেলিভিশন ও বড় পর্দার পরিচিত মুখ লাবনী সরকার দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁর অনবদ্য অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করে চলেছেন। কখনও মায়ের চরিত্রে, কখনও দৃঢ়চেতা নারীর ভূমিকায়, আবার কখনও হাসি-ঠাট্টায় ভরপুর চরিত্রে তিনি নিজেকে বারবার নতুনভাবে তুলে ধরেছেন। অভিনয় জীবনের পাশাপাশি নিজের স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্বের জন্যও তিনি সমানভাবে পরিচিত। জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও সততাকেই নিজের বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র বলে মনে করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাজনীতি, সম্পর্ক এবং আত্মসম্মান নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।

লাবনী সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, তিনি নিজের মতামত প্রকাশ করতে কখনও পিছপা হন না। ইন্ডাস্ট্রির নানা বিষয় নিয়ে হোক কিংবা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানাতে ভালোবাসেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, জীবনে সব সময় এমনভাবে চলার চেষ্টা করেছেন যাতে কাউকে ছোট না করতে হয় কিংবা কাউকে কষ্ট না দিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করা যায়। মানুষের প্রতি সম্মান এবং সততার সঙ্গে জীবন কাটানোর শিক্ষা তিনি পরিবার থেকেই পেয়েছেন। তাই কোনও বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার আগে তিনি সবসময় একজন মানুষ হিসেবে বিষয়টিকে বিচার করার চেষ্টা করেন। রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে লাবনী সরকার অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে বিভ্রান্ত করে।

তাঁর কথায়, “কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যে বলছে, সেটা বোঝাটা আজ খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখেন এবং সেই কারণেই রাজনীতির জটিল সমীকরণ তাঁকে ভাবায়। একই সঙ্গে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন। যাঁদের এতদিন সাধারণ মানুষ এক ধরনের পরিচয়ে চিনেছেন ও ভালোবেসেছেন, তাঁদের হঠাৎ অন্য এক রাজনৈতিক পরিচয়ে দেখতে পাওয়াটা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। যদিও তিনি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ না করেই নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন।

নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে লাবনী সরকার জানিয়েছেন, তিনি অত্যন্ত দৃঢ় এবং কঠোর মানসিকতার মানুষ। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে তিনি কখনও কারও ওপর নির্ভর করেননি, বরং একাই সমস্ত সমস্যার মোকাবিলা করেছেন। তাঁর ভালো লাগা, খারাপ লাগা কিংবা মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গী ছিলেন তিনি নিজেই। অভিনেত্রীর কথায়, তাঁর ভেতরের কষ্ট এবং অঝোরে ঝরে পড়া চোখের জলের সাক্ষী একমাত্র তাঁর বালিশ। বাবা তাঁকে ছোটবেলা থেকেই একটি মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছিলেন প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখো, আর যদি নিজের চোখে নিজেকে সম্মান করতে পারো, তবেই বুঝবে তুমি সঠিক পথে এগোচ্ছো। সেই শিক্ষাই আজও তাঁকে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে পথ দেখায়।

আরও পড়ুনঃ “দাদু মা’রা যেতেই সুপ্রিয়া আন্টি ওঁকে বিয়ের মিথ্যে দাবি করেছিলেন…হিন্দুশাস্ত্র মতে তো প্রথম বউ থাকার পর বিয়ে করা যায় না!” সুপ্রিয়া দেবীকে নিয়ে মন্তব্য করেই চরম বিতর্কে উত্তম কুমারের নাতনি নবমিতা! ‘আপনার বাবার তো দুটো বউ, টাও ডিভোর্স না দিয়ে, তাঁর দোষটা মাফ?’ ‘মহানায়কের মৃ’ত্যু সময় তো আপনার বয়স একও হয়নি, এইসব গল্প বানিয়ে আর কতদিন চালাবেন?’ কটাক্ষ নেটপাড়ার!

বৈবাহিক জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লাবনী সরকার এমন এক ত্যাগের কথা তুলে ধরেছেন, যা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। স্বামী কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পক্ষের ছেলে সুস্নাত যখন তাঁদের জীবনে আসে, তখন সে ছিল মা-হারা, মানসিকভাবে অনিরাপদ এক ছোট্ট শিশু। সেই শিশুর মনে যাতে কখনও এই অনুভূতি না জন্মায় যে, নিজের সন্তানের জন্য তাকে অবহেলা করা হচ্ছে, সেই কারণেই তিনি নিজে আর সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। সুস্নাতকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করে তুলেছেন তিনি। লাবনী সরকারের মতে, এই সিদ্ধান্ত কোনও সাধারণ ত্যাগ নয়, বরং এটি ভগবানের আশীর্বাদ। একজন মা-হারা সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেওয়ার সুযোগ পাওয়াকে তিনি ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবেই দেখেন। তাঁর এই মানবিকতা ও আত্মত্যাগ আজও প্রমাণ করে, একজন মানুষ হিসেবে বড় হওয়াটাই তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

You cannot copy content of this page