“বাবা বছরে দু’বার মসজিদে গিয়ে নমাজ পড়তেন শুধু ইদের দিনই, কিন্তু প্রতিদিন মায়ের ঠাকুরঘরে প্রণাম না করে ঘরে ঢুকতেন না!” উস্তাদ রাশিদ খানের ছেলে আরমানের হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতিচারণ ভাইরাল! স্ত্রী হিন্দু হলেও ধর্মচারণে বাধা দেননি, বরং অংশ নিতে নিজেও! প্রকাশ্যে প্রয়াত শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন ও মানবিকতার বিরল তথ্য! অজানা অধ্যায় সামনে আসতেই নতুন করে আবেগে ভাসলেন অনুরাগীরা!

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম উজ্জ্বল নাম ছিলেন উস্তাদ রাশিদ খান (Ustad Rashid Khan)। তাঁর সুরের জাদু যেমন দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের হৃদয় জয় করেছিল, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল এবং পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ। সম্প্রতি তাঁর ছেলে আরমান খানের এক আবেগঘন স্মৃতিচারণে বাবার জীবনের এমন অনেক দিক তুলে ধরেছেন, যা আগে খুব কম মানুষই জানতেন। তাঁর কথায়, পরিবারের কাছে রাশিদ খান আজও হারিয়ে যাননি। শুধু থাকার জায়গা বদলেছে। তাই বাড়িতে আজও কেউ তাঁকে নিয়ে অতীত কালে কথা বলেন না। প্রতি বছরের মতো এখনও তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়। সেই দিন বাবার প্রিয় বিরিয়ানি এবং শাম্মি কাবাব রান্না হয় তাঁরই বিশেষ রেসিপি মেনে। পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা একত্রিত হয়ে তাঁকে স্মরণ করেন।

ছেলের কথায়, রাশিদ খান শুধু বড় শিল্পীই ছিলেন না, বাড়ির ভিতরে ছিলেন একেবারে শিশুসুলভ মানুষ। বিশেষ করে আইসক্রিম কেক তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। প্রতি বছর রাত বারোটায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে জন্মদিনের কেক কাটতেন তিনি। যদি কেউ আইসক্রিম কেক উপহার দিতেন, তাহলে প্রথম দু’টুকরো কেটে বাকিটা প্রায় একাই খেয়ে ফেলতেন। সন্তানরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলে তিনি মজা করে বলতেন, “একটা নতুন কেক কিনে নিয়ে এসো। ওটা তোমাদের জন্য!” আবার কখনও খুব আনন্দে থাকতেন, কখনও হঠাৎই অভিমান করতেন। দুষ্টুমি করলে সন্তানদের বকাঝকা করলেও সহজে গায়ে হাত তুলতেন না। তবে দুই মেয়ের প্রতি তাঁর আলাদা দুর্বলতা ছিল। ছেলে অভিযোগ করলেও তিনি বেশিরভাগ সময় দুই মেয়ের পক্ষই নিতেন।

রাশিদ খানকে নিয়ে একটি মজার ঘটনাও শোনান তাঁর ছেলে। সাধারণত স্কুলে অভিভাবক বৈঠকে মা যেতেন। কিন্তু একবার মায়ের অন্য কাজ থাকায় বাবাকে যেতে হয়। স্কুলে পৌঁছে শিক্ষিকা বিখ্যাত শিল্পীকে সামনে পেয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন যে দীর্ঘক্ষণ তাঁর সঙ্গে গল্পে মেতে থাকেন। পরে রাশিদ খান জানতে চান, “আমার ছেলে কেমন পড়াশোনা করছে?” তখন শিক্ষিকা হেসে বলেন, “ও তো মাত্র তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। এখনই পড়াশোনা নিয়ে ভাবার কিছু নেই।” এই ঘটনাটি আজও পরিবারের কাছে হাসির স্মৃতি হয়ে রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন খুবই অভিমানী মানুষ। স্ত্রীকে নিয়ে কোনও বিষয়ে মন খারাপ হলে দিনের পর দিন কথা বলতেন না। ছেলে কারণ জানতে চাইলে বলতেন, “তোদের মাকে জিজ্ঞাসা কর।” আবার মা-ও একইভাবে বলতেন, “তোদের বাবার কাছেই জানতে চাও।” শেষ পর্যন্ত সন্তানদেরই মাঝখানে পড়তে হতো।

ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও রাশিদ খান ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। তাঁর ছেলে জানান, বাবা নিজের ধর্ম নিয়ে কখনও বাড়াবাড়ি করতেন না। নিয়মিত কোরআন পড়তে তাঁকে দেখা যেত না। বছরে শুধু ইদের সময় মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতেন। অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী হিন্দু হওয়ায় বাড়িতে একটি ঠাকুরঘরও তিনিই তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেখানে প্রতিদিন নিয়ম করে পূজা হতো। বাড়িতে ফিরেই তিনি আগে হাত-পা ধুয়ে সেই ঠাকুরঘরের সামনে জোড় হাতে প্রণাম করতেন, তারপর বাড়ির অন্য কাজে যেতেন। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের ধর্মকে সম্মান করার মানসিকতাই তাঁদের সংসারের অন্যতম বড় শক্তি ছিল বলে মনে করেন তাঁর ছেলে।

তবে তাঁদের পরিবারকে ঘিরে নানা সময়ে নানা গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল। এই প্রসঙ্গে রাশিদ খানের ছেলে বলেন, অনেকেই তাঁদের পারিবারিক জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর নিজের ধারণা, ভিন্ন ধর্মের দু’জন মানুষ সুখে-শান্তিতে একসঙ্গে সংসার করছেন, এই বিষয়টি হয়তো অনেকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। সেই কারণেই নানা ধরনের গুজব তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের পরিবারে ভালোবাসা, অভিমান, হাসি, রাগ সবকিছু মিলিয়েই একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল। তাই বাইরের আলোচনা তাঁদের পারিবারিক বন্ধনকে কোনওদিন প্রভাবিত করতে পারেনি।

আরও পড়ুনঃ “কাকে বোকা বানাচ্ছেন শ্রীলেখা? প্রতিবাদ করতেই পারেন, কিন্তু তা যেন সমাজে অ’শ্লীলতা বা বিকৃতি না ছড়ায়!” নজর কাড়তে ‘ঠুনকো গিমিক’-এর আশ্রয়ের প্রয়োজন হয় না! শ্রীলেখা মিত্রের ‘চশমা পরিনি, তাই দেখিনি’ দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কু’রুচিকর পোস্টার বিতর্কে মুখ খুললেন ববি চক্রবর্তী! একহাত নিয়ে কী বললেন অভিনেতা?

শেষে বাবাকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তাও দেন তিনি। তাঁর কথায়, আগামী জন্মেও তিনি রাশিদ খানের ছেলেই হতে চান। যদিও বাবার মতো কিংবদন্তি শিল্পীর সন্তান হওয়ার চাপ সবসময়ই অনুভব করেন, তবুও তিনি জানেন, আর একজন রাশিদ খান কখনও তৈরি হবে না। তাই বাবার মতো হওয়ার চেষ্টা নয়, তাঁর ঐতিহ্য ও সম্মানকে ধরে রাখাই তাঁর লক্ষ্য। বাবার উদ্দেশে তিনি বলেন, “বাবা, তুমি আরও একবার আমার বাবা হয়ে ফিরো। আমি আবার তোমার ছেলে হব। আগের মতোই দুষ্টুমি করব, আর তুমি আগের মতোই আমাকে বকবে। তোমার সেই বকুনি ছাড়া আমি মানুষ হতে পারব না বাবা।”

You cannot copy content of this page