“ওর সমর্থ ছেলে মা’রা গেছে, তাই কোমর ভে’ঙে গেছে, আঁচল খসে গেছে…” মায়ের এই একটি উক্তি কীভাবে বিশ্বনাথ বসুর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠেছিল? আজও কেন সেই স্মৃতি ভুলতে পারেন না তিনি? বহু বছর পর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অমূল্য শিক্ষা ও হৃদয়ছোঁয়া জীবনদর্শনের কথা ভাগ করে নিলেন অভিনেতা!

বিনোদন জগতের শিল্পীদের জীবনের অনেক কথাই পর্দার আড়ালে থেকে যায়। দর্শক তাঁদের অভিনয় দেখেন, চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের আবেগ জড়িয়ে ফেলেন, কিন্তু প্রিয় অভিনেতা বা অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ভাবনা, জীবনদর্শন কিংবা অভিনয়ের নেপথ্যের গল্প অনেক সময়ই অজানা থেকে যায়। আর সেই শিল্পীরাই যখন নিজেদের জীবনের কথা নিজের মুখে তুলে ধরেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। তেমনই এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়, পরিবার, স্ত্রী এবং দর্শকদের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন অভিনেতা বিশ্বনাথ বসু।

বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ বিশ্বনাথ বসু। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, সিনেমা এবং বিভিন্ন ধরনের শোয়ের সঙ্গে যুক্ত তিনি। অভিনয়কে শুধু পেশা হিসেবে নয়, দর্শকের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ব হিসেবেও দেখেন অভিনেতা। নিজের অভিনয়ের ধরন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট করে জানান, তাঁর কাছে অভিনয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল অনুভূতিকে কতটা গভীরভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। নিজের শিক্ষাগত বা নান্দনিক যোগ্যতা নিয়ে বড়াই করার পরিবর্তে তিনি বরং নিজেকে দর্শকের ‘চাকর’ হিসেবেই ভাবতে ভালোবাসেন।

তবে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে বলতে গিয়ে একেবারে অন্য রকম একটি প্রসঙ্গ তুলে ধরেন বিশ্বনাথ। স্ত্রী তাঁকে কীভাবে দেখেন, সেই প্রসঙ্গে মজার ছলে তিনি বলেন, ‘‘যতই ভালো মানুষের মুখ করো, তুমি যে কী জিনিস, আমি জানি তো!’’ স্ত্রীর এই মন্তব্যই তাঁকে নিজের সম্পর্কে ভাবিয়েছে বলে জানান অভিনেতা। এরপরই তিনি নিজের অভিনয়ের দর্শন ব্যাখ্যা করেন। তাঁর কথায়, প্রেমিক হিসেবে কারও হাত ধরার সময়, ভাই হিসেবে হাত ধরার সময় কিংবা বাবা হিসেবে হাত ধরার সময় প্রতিটি সম্পর্কের অনুভূতিকে তিনি কতটা ভালোভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন, সেটাই তাঁর কাছে আসল বিষয়। অভিনয়ের কোনও নির্দিষ্ট ব্যাকরণ তাঁর অভিধানে না থাকলেও অনুভূতিকে অনুসরণ করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।

বিশ্বনাথ আরও জানান, তাঁর অভিনয়জীবনের ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল ছোটবেলার একটি ঘটনা। তাঁর মা একবার তাঁর বাবার অফিসের বার্ষিক অনুষ্ঠানে নাটক দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে অভিনয় করছিলেন বেবি । তাঁর মায়ের কোনও বিশেষ সার্টিফিকেট বা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছিল না, বড় থিয়েটার দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল না। কিন্তু অভিনয় দেখতে দেখতে তিনি এমন একটি মন্তব্য করেছিলেন, যা বিশ্বনাথের মনে গভীর ছাপ ফেলে। বেবির অভিনয় দেখে তাঁর মা বলেছিলেন, ‘‘ওর সমর্থ ছেলে মারা গেছে, তাই ওর কোমর ভেঙে গেছে, আঁচল খসে গেছে।’’ মায়ের সেই অনুভূতির ব্যাখ্যাই অভিনেতার কাছে অভিনয়ের আসল শক্তির উদাহরণ হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, একজন দর্শক চরিত্রের অনুভূতি নিজের মতো করে অনুভব করতে পারছেন কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ “আমি হলাম অসুরের অবতার!” হঠাৎ কেন এমন দাবি সুদীপ মুখার্জির? নেপথ্যে ছোটবেলার কোন ঘটনা? সেনা পরিবারের ছেলে, শুধু অভিনয় নয়, জীবনদর্শনেও ব্যতিক্রমী! নিজের জন্মঘিরে অজানা ও অদ্ভুত কাহিনি প্রকাশ্যে এনে চমকে দিলেন অভিনেতা?

নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও স্পষ্ট করে বলেন বিশ্বনাথ। তাঁর মতে, দর্শক তাঁর কাছে বসে থাকেন, তাই তাঁদের খুশি করার দায়িত্ব তাঁর রয়েছে। একইসঙ্গে কোনও প্রযোজক যে পরিশ্রম করে টাকা বিনিয়োগ করছেন, সেই অর্থ এবং তাঁর জন্য তৈরি করা সেট, আলো ও সময়েরও মূল্য রয়েছে। সেই কারণেই শো, ফাংশন কিংবা সিনেমা সব জায়গাতেই নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বা উৎপল দত্তের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে নিজের তুলনা টানতে গিয়ে তিনি বিনয়ের সঙ্গেই বলেন, তাঁদের মতো আলাদা কোনও গুণ নিজের মধ্যে আছে বলে তিনি মনে করেন না। বরং দর্শক তাঁকে গ্রহণ করেছেন বলেই প্রতিদিন নতুন করে ভালো করার প্রত্যাশা নিয়ে কাজ করেন। তাঁর কাছে শেষ কথা একটাই দর্শককে ভালো লাগাতে পারলে তবেই অভিনেতা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পূরণ হয়।

You cannot copy content of this page