“দিদিকে বলবেন তিনি যেন ওই টাকা দিয়ে মিষ্টি খান!” “মুখের ওপর সেদিন টাকা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম…লোভী হলে নাম-টাকার জন্য আমাকে এসব লোকের সঙ্গে মিশতেই হত!” কোন ঘটনা ঘিরে হঠাৎ বি*স্ফোরক অশোক কুমার? বদলের আবহে ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশে কী এমন দেখলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা, যে ভালো চরিত্রের প্রস্তাব পেলেও আর ক্যামেরার সামনে ফিরতে চাইছেন না?

বাংলা অভিনয় জগতের দীর্ঘ পথের সাক্ষী বর্ষীয়ান অভিনেতা অশোক কুমার। থিয়েটার, যাত্রা, সিনেমা থেকে ধারাবাহিক বিনোদনের প্রায় প্রতিটি মাধ্যমেই নিজের অভিনয় প্রতিভার ছাপ রেখেছেন তিনি। তরুণ মজুমদার, তপন সিনহার মতো কিংবদন্তি পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন, কখনও নায়ক, কখনও সমান্তরাল চরিত্র, আবার কখনও গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে দর্শকের নজর কেড়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ অভিনয় জীবনের পর বর্তমানে বাংলা সিনেমা থেকে অনেকটাই দূরে তিনি। কেন সিনেমা করা ছেড়ে দিলেন? বর্তমান ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতাই বা কী? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই সব প্রশ্নেরই খোলামেলা উত্তর দিয়েছেন অভিনেতা।

অশোক কুমারের কথায়, সিনেমা থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ এখনকার শুটিংয়ের ধরন। তাঁর মতে, আগের তুলনায় বর্তমানে সিনেমার কাজ অনেক বেশি আউটডোরনির্ভর হয়ে উঠেছে। আগে টালিগঞ্জকেন্দ্রিক শুটিংয়ের সুযোগ বেশি থাকলেও এখন স্টুডিওগুলির অধিকাংশই ধারাবাহিকের কাজে ব্যস্ত। ফলে সিনেমায় কাজ করতে গেলে বাইরে যেতে হয়, যা এখন আর তাঁর ভালো লাগে না। জীবনের একটা বড় সময় দেশ-বিদেশে ঘুরে শুটিং করেছেন তিনি। তাই বর্তমানে পাঁচ মিনিটের পথেও যেতে বিরক্তি লাগে বলে জানান। তাঁর কাছে এখন ভালো চরিত্র পেলেও যদি কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, সেই কাজ করার আগ্রহ অনেকটাই কমে যায়।

শুধু শুটিংয়ের জায়গা নয়, বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ নিয়েও আক্ষেপ রয়েছে তাঁর। অশোক কুমারের দাবি, আগের দিনের শিল্পীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ‘মিনিমাম স্তর’ ছিল। তাঁরা প্রত্যেকে মানুষ হিসেবেও একটি আলাদা মর্যাদা বজায় রাখতেন। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই শিক্ষাগত বা পেশাগতভাবে বেশি যোগ্য হলেও সেই মানসিক স্তর বা পারস্পরিক সম্মানের জায়গাটি তিনি সবসময় খুঁজে পান না। এমন পরিস্থিতিতে কাজ করতে গিয়ে মাঝে মাঝে অস্বস্তি হয় বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। আর সেই অস্বস্তি এড়াতেই কাজের প্রতি নিজের লোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন বলে জানিয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা।

ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারে। একবার এক প্রযোজকের সঙ্গে পারিশ্রমিক নিয়ে তাঁর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে রাগের মাথায় টাকা মুখের উপর ছুড়ে দিয়েছিলেন তিনি। অশোক কুমারের বয়ানে, পারিশ্রমিকের অঙ্ক নিয়ে আগেই কথা হয়েছিল। কিন্তু শুটিংয়ের দিন গিয়ে অন্য অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রযোজকের সঙ্গে কথা বলার পরও যখন পরিস্থিতি বদলায়নি, তখন উত্তেজিত হয়ে টাকা ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, দিদিকে বলবেন তিনি যেন ওই টাকা দিয়ে মিষ্টি খান। যদিও বর্তমানে সেই ঘটনার বিস্তারিত মনে রাখতে চান না তিনি। নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশি আলোচনা করতেও তাঁর ভালো লাগে না বলে জানিয়েছেন।

তবে এই জায়গায় পৌঁছনোর পথটা মোটেই সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন। প্রথমে নিজের ব্যবসা ছিল, এমনকি বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে থিয়েটার ও যাত্রার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। দক্ষিণ পরিষদের মাধ্যমে থিয়েটারে কাজ শুরু করেন তিনি। পরে যাত্রায় গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য এক দর্শককে আবিষ্কার করেন। গ্রামের দর্শকদের গভীরতা ও সততা তাঁকে অবাক করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও বেশি লেখালেখি ও অভিনয়ের দিকে টেনে নেয়। শেষ পর্যন্ত ব্যবসা ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।

সিনেমায় তাঁর প্রবেশও ছিল বেশ অদ্ভুত। অজয় দাসের সূত্রে সুকেন দাসের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। মাত্র ২৭-২৮ বছর বয়সে এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করেন, যা তাঁর বয়সের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ছিল। প্রথম ছবির পরই তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে। এরপর তরুণ মজুমদারের ছবিতে কাজের সুযোগ আসে এবং ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমায় নিজের জায়গা তৈরি করে নেন তিনি। পরবর্তীতে যাত্রা ও সিনেমার পাশাপাশি ধারাবাহিকেও নিয়মিত দেখা যায় তাঁকে।

অশোক কুমারের অভিনয় জীবনের আর একটি বড় অধ্যায় কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। তাঁর কথায়, সৌমিত্রর মতো গুণী মানুষের সঙ্গে আড্ডায় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। কখনও ব্যক্তিগত বা অশালীন প্রসঙ্গ উঠলেও একসময় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অশোক কুমার তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজের কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন। অশোক কুমারের কাছে সেটিই ছিল প্রকৃত মর্যাদা ও শিক্ষার উদাহরণ।

আরও পড়ুনঃ প্রেম করে বিয়ে, আজ একই ছাদের নীচে থেকেও কি কাটেনি দূরত্ব? ‘গায়ের রং নিয়ে অপমান’ থেকে ‘রূপের অহংকার’ ও ইগোর লড়াই, বোধিসত্ত্ব মজুমদারের সঙ্গে দাম্পত্যের অজানা অধ্যায় ফাঁস করে বি*স্ফোরক অনামিকা সাহা!

বর্তমান ধারাবাহিক নিয়েও তাঁর প্রত্যাশা স্পষ্ট। ভালো চরিত্র পেলে এখনও অভিনয় করতে রাজি তিনি। কিন্তু শুধু মুখ দেখানো বা দু-একটি সংলাপ বলে চলে যাওয়ার মতো কাজ করতে চান না। তাঁর মতে, একজন অভিনেতার চরিত্রের গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই আজও ভালো স্ক্রিপ্ট ও ভালো চরিত্রের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতায় তাই একদিকে যেমন রয়েছে সাফল্যের অসংখ্য গল্প, তেমনই রয়েছে বদলে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে একরাশ আক্ষেপ।

You cannot copy content of this page