আসবেন কিনা ঠিক ছিল না, শেষমেশ রাত ৯টায় এসেই যা করলেন মহানায়িকা…দেখে উপস্থিত সকলেই হয়ে গিয়েছিলেন হতবাক? সেদিন প্রিয় নায়ক উত্তম কুমার ও স্ত্রী গৌরীদেবীর শত অনুরোধেও কেন খাননি কিচ্ছু? জানেন, মহানায়কের ছেলের বৌভাতে কী এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়ক উত্তম কুমার শুধু পর্দার তারকা ছিলেন না, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার নিয়েও দর্শকদের আগ্রহ ছিল প্রবল। বিশেষ করে তাঁর একমাত্র পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের বিয়ে ঘিরে সেই সময় তৈরি হয়েছিল বিশেষ উন্মাদনা। ছেলের বৌভাতও তাই হয়ে উঠেছিল তারকাখচিত এক বিশেষ অনুষ্ঠান। চট্টোপাধ্যায় পরিবার ছিল বড় পরিবার। সেই কারণে বৌভাতের আয়োজনও হয়েছিল দু’ভাগে। একদিন ছিল আত্মীয়-স্বজন ও কুটুম্বদের জন্য, আর অন্যদিন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্টদের। সেই সন্ধ্যায় কার্যত তারকাদের চাঁদের হাট বসেছিল বলে জানা যায়। উত্তম কুমারের একমাত্র পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুমনা চট্টোপাধ্যায়ের বিয়ে ছিল পরিবারের কাছে বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত।

জানা যায়, পুত্রবধূকে পছন্দ করার ক্ষেত্রেও উত্তম কুমারের ভূমিকা ছিল। বৌভাতের দিন নিজে পরেছিলেন পাঞ্জাবি ও ময়ূরপুচ্ছ ধুতি। অন্যদিকে নতুন বউ সুমনাকে সাজানো হয়েছিল শাড়ি, গয়না ও বেনারসি দিয়ে। গৌরীদেবীরও গয়নার প্রতি বিশেষ পছন্দ ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরিবারের অনুষ্ঠান হলেও উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার কারণে সেই বৌভাতের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা কলকাতায়। তবে এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠেছিল অন্য এক তারকার আগমন। নিমন্ত্রণ পেয়েও প্রথমে আসবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। ভিড়ের কথা ভেবেই তাঁর এই দোনামোনা ছিল বলে জানা যায়।

তখন তিনি ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু তরুণ কুমার তাঁকে বোঝান, অনুষ্ঠানটি ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনে, অর্থাৎ তাঁর বাড়ির কাছেই। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ সেখানে এসে পৌঁছন সুচিত্রা সেন। অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত তরুণ কুমারের কাছে খবর পৌঁছতেই তিনি উত্তম কুমারকে জানান। মহানায়িকা এসেছেন শুনে উত্তম কুমারও দ্রুত তাঁর কাছে চলে আসেন। সুচিত্রা সেন সেখানে পৌঁছেই নাকি খুঁজতে শুরু করেন, “কই আমার হিরো কোথায়?” সেদিন শাড়ির বদলে মেখলা পরেছিলেন সুচিত্রা সেন। তাঁকে দেখতে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়।

উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন পরস্পরের দিকে এগিয়ে গিয়ে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। নতুন বউ সুমনা ও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গৌরীদেবীর সামনেই ঘটে যায় সেই আবেগঘন মুহূর্ত। উপস্থিত ফটোগ্রাফাররা এমন বিরল দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। তাঁদের অনুরোধে নতুন বউয়ের সঙ্গে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের ছবিও তোলা হয়। পরে উত্তম কুমার সুচিত্রাকে খাওয়ার অনুরোধ করলে তিনি জানান, বাইরে কোথাও তিনি সাধারণত খাবার খান না এবং ভিড়ের কারণে প্যান্ডেলে গেলে সমস্যা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত মহানায়কের অনুরোধে একটি সন্দেশ মুখে দেন তিনি। তবে অনুষ্ঠান থেকে বিদায় নেওয়ার আগে সুচিত্রা সেন এমন একটি কাজ করেছিলেন, যা উপস্থিত অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।

আরও পড়ুনঃ “আমি মানুষদেরকে ছেড়ে দিতে পারি না, আমার সবচেয়ে বড় ‘ব্যাড হ্যাবিট’ হচ্ছে…” কেন চাইলেও কোনও মানুষকে জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারেন না সোহিনী সেনগুপ্ত? কোন সেই দুর্বলতার কাছে বারবার হার মানেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী, আঁকড়ে থাকার সেই অভ্যাসই আজ কীভাবে হয়ে উঠেছে তাঁর অসহায়তার কারণ?

তিনি উত্তম কুমার ও গৌরীদেবীর দু’জনের হাত নিজের হাতে নিয়ে একত্র করে দিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, দু’জন যেন এভাবেই একে অপরের হাত ধরে থাকেন, কখনও যেন হাত না ছাড়েন। প্রায় এক ঘণ্টা বৌভাতের অনুষ্ঠানে থাকার পর ছোট ভগ্নিপতি বারিন ধরকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান মহানায়িকা। পরবর্তীতে এই ঘটনার দিকে ফিরে তাকালে তা আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে। কারণ এর মাত্র দু’বছর পরেই প্রয়াত হন মহানায়ক উত্তম কুমার। ফলে গৌতম-সুমনার বৌভাতের সেই সন্ধ্যায় উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের সাক্ষাৎ এবং বিদায়ের আগে মহানায়িকার সেই বিশেষ মুহূর্ত আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রয়েছে।

You cannot copy content of this page