শিল্পীদের জীবন বাইরে থেকে যতটা রঙিন মনে হয়, ভেতরে ততটাই অনিশ্চয়তায় ভরা। আলো, ক্যামেরা, করতালির আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ অপেক্ষা, আর্থিক টানাপোড়েন আর আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই। বিশেষ করে মঞ্চশিল্পীদের ক্ষেত্রে এই সংগ্রাম আরও কঠিন—একটি সুযোগই বদলে দিতে পারে জীবন, আবার একটি ব্যর্থতাই ঠেলে দিতে পারে অন্ধকারে।
এই বাস্তবতারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ মীরাক্কেল-এর পরিচিত মুখ পলাশ অধিকারী। কোলে বসা পুতুলকে কথা বলিয়ে দর্শককে হাসানোর সেই শিল্পী আজও বাঙালির মনে জায়গা করে আছেন। এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলা—সব জায়গাতেই তাঁর পুতুলের কাণ্ডকারখানা ছিল সমান জনপ্রিয়। তবে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে পলাশ নিজের জীবনের অন্য দিক তুলে ধরেছেন, যা অনেকেরই অজানা।
প্রায় ২৪ বছর ধরে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছেন মায়াস্বর শিল্প বা ভেন্ট্রিলোকুইজমের সঙ্গে অর্থাৎ ঠোঁট না নাড়িয়ে কথা বলার এক বিশেষ শিল্প। মীরাক্কেল চলাকালীন নানা পুতুল নিয়ে বিভিন্ন চরিত্রে হাজির হয়েছেন তিনি। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সময়ের স্রোতে কিছু চরিত্র ম্লান হয়ে গেলেও থেমে থাকেনি তাঁর নাট্যসত্তা। “বিলের ডায়েরি” নামের একটি ছবিতেও কাজ করেছেন। শুধু পুতুল নয়, কমল মিত্র কিংবা ছবি বিশ্বাসের মিমিক্রি করেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তাঁর কথায়, “মাচা শিল্পী হিসেবে নিজেকে যাপন করতে আনন্দ পাই।”
তবে এই পরিচিতির পথ মোটেই সহজ ছিল না। ছোটবেলায় দূরদর্শনের ‘চিচিং ফাঁক’ দেখে প্রবীর স্যারের পুতুলের প্রতি ঈর্ষা থেকেই শুরু হয় তাঁর আগ্রহ। যদিও সরাসরি হাতেকলমে শিক্ষা পাননি, তবু প্রবীর স্যারকেই তিনি নিজের গুরু মানেন। প্রথম ভেন্ট্রিলোকুইজ ডামিটি কিনেছিলেন পড়ার এক বৌদির কাছ থেকে। সেই হাতে বানানো পুতুলই পরে মীরাক্কেলে জনপ্রিয় হয়। পলাশ বিশ্বাস করেন, “পুতুলগুলোই আমাকে খাওয়াচ্ছে”—অর্থাৎ এই শিল্পই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আরও পড়ুনঃ “আমাকেও এবার সম্মান দেওয়া হোক!” অনিন্দিতার করা মামলার প্রেক্ষিতে আগাম জামিন পেয়ে মুখ খুললেন হিরণ চট্টোপাধ্যায়! দ্বিতীয় বিয়ে বিত’র্কে, প্রথম স্ত্রীর উদ্দেশ্যে কী বার্তা তাঁর?
সংগ্রামের কাহিনিও কম নয় পলাশের জীবনে, ২০০৫ সালে মাত্র ৫০০ টাকার জন্য পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও শেষমেশ ফিরতে হয়েছিল শুধুমাত্র একটি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে। বর্তমানে পলাশের বাবা আর নেই, কিন্তু মীরাক্কেলের সময় শো শেষ হতেই বাবা উত্তেজিত হয়ে মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন ছেলের পারফরম্যান্স কেমন লাগল। সেই প্রশংসা আজও ভীষণ মিস করেন তিনি। পরিচিতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই কঠিন পথচলাই যেন প্রমাণ করে—হাসির আড়ালেও থাকে গভীর সংগ্রামের গল্প।






