কলকাতার সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র একাডেমি অফ ফাইন আর্টস। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পী, নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমি বাংলার শিল্প ও নাট্যচর্চার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু সম্প্রতি সেই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানই বিতর্কের কেন্দ্রে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একাডেমির একটি অংশের সাদা রং মুছে ফের গেরুয়া রং করা ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। সরকার পরিবর্তনের পর গত মাসে একাডেমির একটি অংশ গেরুয়া রং করা হয়েছিল।
তা নিয়ে আপত্তি জানান চন্দন সেন, বিভাস চক্রবর্তী, অরুণ মুখোপাধ্যায়, অশোক মুখোপাধ্যায়-সহ একাধিক বর্ষীয়ান নাট্যব্যক্তিত্ব। প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা বিজেপির রাজ্য সভাপতিকে চিঠিও দেন। অভিযোগ, তাতে কাজ না হওয়ায় নিজেদের উদ্যোগেই তাঁরা ওই অংশটি ফের সাদা করে দেন। কিন্তু সেই রং পুরোপুরি শুকিয়ে ওঠার আগেই বুধবার সেখানে আবার গেরুয়া রঙের প্রলেপ পড়ে। এই কাজের সময় উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা তথা শিবপুরের বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ। রং বদল নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন নাট্যকর্মী জয়রাজ ভট্টাচার্য।
তাঁর বক্তব্য, বাংলার নান্দনিকতার উপর রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার আক্রমণ চলছে। যারা ওই ঘরটি গেরুয়া করেছেন, তাঁদের ইতিহাস সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। অভিনেতা নন্দন সেনেরও দাবি, ঘরটির রং কোনওদিনই গেরুয়া ছিল না। রাজ্যের বিজেপি শাসকরা অন্য কথা বললেও সেটি সত্যি নয় বলেই তাঁর বক্তব্য। ফলে এই রং বদল শুধুই সৌন্দর্যায়নের কাজ, নাকি এর পিছনে রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এই বিতর্কের মাঝেই রুদ্রনীল ঘোষের পাল্টা বক্তব্যে রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হয়েছে।
বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, “যদি আপনারা চেয়ে থাকেন যে সভ্যতার নামে লেলিন, কার্ল মার্কসের ছবি ঝোলাবেন, তাহলে কোনও রকমের বদমাইশি সহ্য করা হবে না।” তাঁর আরও অভিযোগ, ৩৪ বছর ধরে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের সামনে লাল শালু কাপড় বেঁধে নাস্তিকতা বিক্রি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য একাডেমির রং গেরুয়া করার সমালোচনা করে বলেন, “অসভ্য বর্বর দলেরা ক্ষমতায় এলে যা হয়, ওরা তাই করেছে।” তাঁর প্রশ্ন, ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিল্ডিং গেরুয়া করার সঙ্গে শিল্প, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সম্পর্ক কোথায়?
আরও পড়ুনঃ ছিন্নমস্তা সাজে চুল সরিয়ে বিতর্কিত ভঙ্গি ও ন*গ্ন পশ্চাৎ প্রদর্শন! হিন্দু দেব-দেবীকে ব্যবহার করে সস্তার পাবলিসিটি নিয়ে নেটপাড়ায় তুমুল সমা’লোচনা, ছিছিক্কার! বিতর্কের মুখে পরেই প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন নৃত্যশিল্পী! জানেন, সেদিন মঞ্চে উপস্থিত ওই শিল্পীর পরিচয়?
একাডেমির যে অংশটি রং করা হয়েছে, তার পাশে ভারতমাতার ছবিও দেখা গিয়েছে। ফলে বিতর্ক আরও নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে একদল এই রং বদলকে রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহার হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে রুদ্রনীল ঘোষের বক্তব্যে উঠে এসেছে আগের সরকারের আমলেও প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির ছোঁয়া থাকার অভিযোগ। সব মিলিয়ে সাদা ও গেরুয়া রঙের এই টানাপোড়েন এখন আর শুধুমাত্র একটি দেওয়ালের রং বদলের ঘটনা নয়। বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রে রাজনৈতিক প্রভাব, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বড় প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে এই বিতর্ক।






