জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী প্র’য়াত উস্তাদ রাশিদ খানের (Ustad Rashid Khan) ছেলের পরিচয়ে বড় হলেও, আরমান খানের (Armaan Khan) বেড়ে ওঠা কখনওই আরাম বা সুবিধার মোড়কে ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তাঁর জীবন জুড়ে ছিল কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মিত রেওয়াজ আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা। বাড়ির ভেতরেই চলত চর্চা, কিন্তু তার সঙ্গে জুড়ে থাকত আত্মনির্ভরতার পাঠও। বাবার খ্যাতিতে ভর করে, পরিচিত হয়ে যাওয়ার রাস্তা তাঁর জন্য কখনও খোলা ছিল না। বরং সবকিছু থেকে দূরে নিজের কণ্ঠ, নিজের সাধনার ভিত মজবুত করার পথটাই বেছে নিতে শিখেছিলেন বাবা।
আরমানের কথায়, বাবা ইচ্ছে করেই কখনও তাঁর জন্য সুপারিশ করেননি বা পরিচিতির সুবিধা ব্যবহার করতে দেননি। উস্তাদ রাশিদ খান বিশ্বাস করতেন, বাবা-ছেলের মধ্যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া উচিত নয়। তাই ছেলে যদি খুব তাড়াতাড়ি মঞ্চে বা জনপ্রিয়তার দৌড়ে নামেন, তাহলে তুলনা অনিবার্য হয়ে উঠবে, এই ভয় থেকেই তিনি সচেতন ছিলেন। সেই কারণে আরমানের সঙ্গীতযাত্রা শুরু হয়েছে অনেক ধীরে, অনেক সংযম নিয়ে। আজও তিনি প্লেব্যাকের চেয়ে লাইভ শো আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকেই বেশি গুরুত্ব দেন, কারণ সেখানেই তাঁর শিকড়, সেখানেই তাঁর স্বস্তি।
এই শাসন আর সংযমের ছাপ পড়েছিল দৈনন্দিন জীবনেও। আরমান নিজেই নানা সময়ে বলেছেন, ছোটবেলায় বাবা কখনও দামী জামাকাপড় কিনে দিতেন না। এমনকি বিমানে যাত্রার সময়ও আলাদা আসনে বসাতেন, বরাদ্দ থাকত সাধারণ টিকিট। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, যোগ্যতা অর্জন না করলে কোনও বিশেষ সুবিধা পাওয়া উচিত নয়! সাম্প্রতিক সময়ে আরমানের জীবনে আধ্যাত্মিকতার দিকটাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই বছর বাড়িতে প্রথমবার দুর্গাপূজার আয়োজন করেছেন তিনি, যা আসলে বাবার এক অপূর্ণ ইচ্ছারই রূপায়ণ।
প্রসঙ্গত, উস্তাদ রাশিদ খান ধর্মকে কখনও বিভাজনের চোখে দেখতেন না। আর এই ভাবনাই পরিবারে উত্তরাধিকার হিসেবে এসেছে। আরমানের কাছে ধর্ম মানে আলাদা আলাদা পরিচয়ের দেওয়াল নয়, বরং একসঙ্গে থাকার অভ্যাস, পারিবারিক সংস্কৃতি আর মানুষের প্রতি সম্মান। এই প্রসঙ্গেই ধর্ম নিয়ে বর্তমান সমাজের ক্রমবর্ধমান বিভাজন তাঁকে বিশেষভাবে ব্যথিত করে। আরমান বলেছেন, “আমি যখন ছোট ছিলাম, বাবার কাছে সবার প্রথমে গায়ত্রী মন্ত্র শিখেছি। তারপরেই আমায় শেখানো হয়েছিল, হনুমান চল্লিশা। আসলে, এগুলো একান্তই বাড়ির শিক্ষা।
আরও পড়ুনঃ “উত্তম কুমার কোনওদিন ‘সুপারস্টার-মেগাস্টার’ তকমা শোনেননি, তিনি শুধু উত্তম দা ছিলেন!” “আমি এই শব্দগুলোর প্রয়োজন অনুভব করি না, কাজের মানটা আসল!” টলিউডে তারকাখেতাবের লড়া’ইয়ে স্পষ্ট অবস্থান রঞ্জিত মল্লিকের!
ছোটবেলা থেকেই তো বাড়িতে বিভিন্ন রকমের পুজো, আবার ঈদের সময় অনুষ্ঠান, বড়দিনেও একই দেখে এসেছি। তাই কোনদিনও মনে হয়নি, জিনিসটা আমার না তাই উদযাপন বা উচ্চারণ করব না! আর বিশেষ করে যখন আমরা এমন একটা দেশে থাকি, যেখানে সর্বধর্ম সমন্বয় বলা হয়। এখন যখন ধর্ম নিয়ে এত বিভেদ চোখে পড়ে, মানতে খুব কষ্ট হয়। চিরকাল বাড়িতে সরস্বতী পুজো, গণেশ চতুর্থী হয়ে এসেছে। এখন তো দুর্গাপুজোও শুরু করেছি, বাবার স্বপ্ন ছিল বলে। সেখানে অন্যদের যখন দেখি সবকিছুর আগে ধর্মকে এগিয়ে রাখতে, অপ্রাসঙ্গিক লাগে।” সত্যিই তো, শিল্পীর যেমন কোনও জাত হয় না, ধর্মের ঊর্ধ্বে আমরাও শুধুমাত্র মানুষ!






