আজকের দিনটার তাৎপর্য সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বিভিন্ন রকম হলেও, বাংলার কাছে তা গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। ২১ ফেব্রুয়ারি এলেই ভোরের আলোয় ভেসে ওঠে প্রভাতফেরির সুর, শহিদ বেদিতে ফুল দেওয়া আর ছোট ছোটদের কণ্ঠে আবৃত্তি। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ (International Mother Language Day) দিবস এখন শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, দুই বাংলার মানুষের আবেগের দিন। ঢাকার রাজপথে যে আন্দোলনের আগুন থেকে এই দিনের সূচনা, তার স্মৃতি আজও বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলা ভাষা। ৭৩ বছর আগে মাতৃভাষার স্বীকৃতির দাবিতে যে প্রতিবাদ গর্জে উঠেছিল, তা আজ বিশ্বজোড়া ভাষা-অধিকার আন্দোলনের প্রতীক।
পশ্চিমবঙ্গ হোক বা বাংলাদেশ, এই দিনটিতে স্কুল-কলেজে গান, বক্তৃতা, পোস্টার আঁকা আর আলোচনার মাধ্যমে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। তবু এই উদযাপনের মাঝেও অস্বস্তির ছায়া ঘনীভূত হয়েছে। অভিযোগ উঠছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকেরা শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছেন। কোথাও তাঁদের বাংলাদেশি তকমা দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার শারী’রিক হেন’স্থার শিকার হতে হচ্ছে বলেও শোনা যাচ্ছে।
এমনকি সরকারি চিঠিতেও বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে উল্লেখ করার ঘটনা বিতর্ক তৈরি করেছে। ভাষা যে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, মানুষের পরিচয়ের গভীর অংশ, এই সহজ সত্যটাই যেন বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে! এই প্রেক্ষাপটে সঙ্গীত শিল্পী ‘লোপামুদ্রা মিত্র’ (Lopamudra Mitra) বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাইরে দেখার কথা বলেননি। বরং তাঁর মতে, বাংলা ভাষার ইতিহাসে বাংলাদেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কারণ সেখানে রাষ্ট্রীয় স্তরে বাংলা ব্যবহৃত হয়।
ফলে ভাষার প্রতি তাদের একধরনের দৃঢ় অবস্থান স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা বললেই কাউকে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। মাতৃভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ, এতে আঘাত লাগলে তা স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট দেয়। তবে তিনি আত্মসমালোচনার কথাও তুলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা নিজেরা কতটা যত্নে বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করছেন? অনেক সময় দেখা যায়, বাঙালি নিজেই অন্য এক বাঙালির সঙ্গে কথোপকথনে অকারণে অন্য ভাষার আশ্রয় নিচ্ছেন।
আরও পড়ুনঃ “আমি কখনো নিজের আইডেন্টিটি হারাইনি!” উত্তম কুমারের পরিবারের ছোট বউ হয়েও কেন সেইভাবে নায়িকা হয়ে উঠতে পারেননি সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়? মহানায়কের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল? কেন শেষ জীবনেও তিনি অভিনয়জগত থেকে দূরে ছিলেন?
এই দূরত্বই হয়তো বাইরের মানুষকে বাংলা ভাষা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রথম দায়িত্ব তো ভাষাভাষীরই। তাঁর বার্তা স্পষ্ট, প্রতিবাদের আগে দরকার আত্মসম্মান এবং আত্মচর্চা। ভাষার অধিকার নিয়ে সরব হওয়া জরুরি, কিন্তু সেই সঙ্গে ভাষাকে প্রতিদিনের জীবনে স্নেহ ও সম্মানের জায়গায় রাখা আরও বেশি জরুরি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু অতীতের স্মরণ নয়, বর্তমানের দায়ও মনে করিয়ে দেয়। বাংলা কার? এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা যারা বাংলা ভাষায় বড় হয়েছি, তারা কি তাকে যথার্থ মর্যাদা দিতে পারছি?






