বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী শকুন্তলা বড়ুয়া। নায়িকা হিসেবে অভিনয় জীবন শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে বাংলা সিনেমার একজন শক্তিশালী চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মহানায়ক উত্তম কুমার থেকে শুরু করে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, মহুয়া রায়চৌধুরী, অনিল চট্টোপাধ্যায়-সহ একাধিক কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। কয়েক দশকের অভিনয় জীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবন, ব্যক্তিগত ভাবনা এবং অভিনয় জগতের একাধিক অজানা গল্প তুলে ধরেছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী।
সাক্ষাৎকারে শকুন্তলা বড়ুয়া জানিয়েছেন, তিনি কোনওদিনই প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র নায়িকা হতে চাননি। তাঁর কথায়, গাছের চারপাশে ঘুরে গান গাওয়া কিংবা শুধুমাত্র গ্ল্যামার প্রদর্শন করার মতো চরিত্রে অভিনয় করার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল না। বরং তিনি এমন চরিত্রে অভিনয় করতে চেয়েছেন, যেখানে একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ থাকবে। একটি ছবিতে যদি মাত্র কয়েকটি দৃশ্যও থাকে, কিন্তু চরিত্রটি অভিনয়ের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে সেই চরিত্রেই অভিনয় করতে তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। সেই কারণেই তিনি কখনও নায়িকার ইমেজ ধরে রাখার চেষ্টা করেননি। বরং একজন শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
অভিনয় জগতের নানা অজানা গল্পও উঠে এসেছে তাঁর কথায়। মহানায়ক উত্তম কুমারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, উত্তম কুমার তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সংসারের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতেন। উত্তম কুমার তাঁর ‘হব ইতিহাস’ ছবির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের জন্য শকুন্তলা বড়ুয়াকেই নির্বাচন করেছিলেন। অভিনেত্রীর কথায়, মহানায়কের বিশ্বাস ছিল এই চরিত্রটি তিনি ছাড়া অন্য কেউ সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই মহানায়ককে প্রণাম করে সেই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সম্মতি জানান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ছবির কাজ শুরু হওয়ার আগেই উত্তম কুমারের মৃত্যু হয়। পরে ছবিটির নাম পরিবর্তন হয়ে ‘শত্রু’ রাখা হয়। প্রথমে অভিনেতা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় ছবিটির দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তীকালে চিত্রনাট্য পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর হাতে যায়।
শকুন্তলা বড়ুয়া জানান, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন, উত্তম কুমার যে চরিত্রের জন্য তাঁকে নির্বাচন করেছিলেন, সেই সিদ্ধান্ত যেন কোনওভাবেই পরিবর্তন না করা হয়। মহানায়কের সেই আস্থার মর্যাদা রেখেই তিনি পরবর্তীকালে ছবিটিতে অভিনয় করেন। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় সিনেমায় আসার বহু আগে থেকেই। তাঁর বাবা মেডিক্যাল কলেজের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন এবং সেই সূত্রেই শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক পরিচয় ছিল। মজার ছলে অভিনেত্রী বলেন, ছোটবেলায় তিনি শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে এতটাই পছন্দ করতেন যে মনে মনে ভাবতেন, ভবিষ্যতে যাঁকে বিয়ে করবেন তিনি যেন দেখতে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের মতো হন।
একই সঙ্গে মহুয়া রায়চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি। মহুয়ার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করার পর থেকেই বাংলা সিনেমায় একের পর এক মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করে তাঁর কাছে। যদিও চরিত্র নিয়ে তাঁর কোনও আক্ষেপ ছিল না। বরং একজন শিল্পী হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। দর্শকদের ভালোবাসার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আবেগঘন একাধিক অভিজ্ঞতার কথা শোনান শকুন্তলা বড়ুয়া। তিনি জানান, যাত্রা করতে গেলে বহু দর্শক সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তাঁর নিজের ছেলে। তাঁকে প্রায়ই প্রশ্ন করা হতো, “আপনি আপনার ছেলেকে সঙ্গে আনেননি কেন?” শুধু সাধারণ দর্শকরাই নয়, চলচ্চিত্র জগতের একজন পরিচালকও তাঁকে অসম্ভব ভালোবাসতেন বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।
আরও পড়ুনঃ “আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, এই সংসদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই যেতে পেরেছেন!” “গদ্দার কোথাকার, অন্যকে বেনোজল বলতেন না, নিজে কী এখন?” বর্ষার বৃষ্টিতে রিল, নেটপাড়ায় সমালোচনার ঝড়! তৃণমূল ছেড়ে নতুন শিবিরে যোগ, ‘দলবদলু’ সায়নী ঘোষকে একহাত নিলেন নেটিজেনরা!
যদিও সেই পরিচালকের নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি। শকুন্তলা বড়ুয়ার কথায়, ওই ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে দেখা হলেই দুই পায়ে চুমু খেতেন এবং দীর্ঘক্ষণ তাঁর পা জড়িয়ে বসে থাকতেন। সেই ভালোবাসাকে তিনি আজও ভোলেননি। এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দর্শকরা নিজেদের বাড়ি থেকে নানা উপহার নিয়ে তাঁর জন্য হাজির হতেন। অভিনেত্রীর মতে, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান কোনও পুরস্কার নয়, বরং দর্শকদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসাই তাঁকে আজও একজন সফল শিল্পী হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে।






