“ওকে এক্ষুনি গু*লি করে মে’রে ফেল…” হুকুম দিয়েছিলেন দাদু! প্রাণের চেয়েও প্রিয় নাতনি ছন্দা চট্টোপাধ্যায়কে কেন মে’রে ফেলতে চেয়েছিলেন তিনি? জমিদার পরিবারে ছিল না কিছুর অভাব, তবুও আ’তঙ্কে কেটেছে প্রথম জীবন? সেইসব ভয়ংকর অভিজ্ঞতা পেরিয়ে, কীভাবে তিনি হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী?

বিনোদনের দুনিয়ায় আমরা শিল্পীদের আলোয় মোড়া সাফল্যের গল্পই বেশি দেখি। ক্যামেরার সামনে তাঁদের অভিনয়, জনপ্রিয়তা, সম্মান সবই দর্শকের চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু সেই সাফল্যের পিছনে কতটা সংগ্রাম, কতটা সামাজিক বাধা কিংবা পারিবারিক লড়াই লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় অজানাই থেকে যায়। বিশেষ করে এক সময় যখন অভিনয় জগতে নারীদের কাজ করাকে সমাজের অনেকেই ভালো চোখে দেখতেন না, তখন অসংখ্য শিল্পীকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে। কিংবদন্তি অভিনেত্রী ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবনের এমনই এক অজানা অধ্যায় তুলে ধরেছেন, যা আজও অনেককে বিস্মিত করবে।

বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক, যাত্রা, বেতার ও টেলিভিশনের এক উজ্জ্বল নাম ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। প্রায় সাত দশকের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তাঁর অভিনয় জীবন শুরু। যাত্রা মঞ্চে তিনি একসময় ‘স্বপ্ন সুন্দরী’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরে বাংলা সিনেমা, টেলিভিশন এবং মঞ্চে একের পর এক উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘কালবেলা’, ‘চারুলতা ২০১১’, ‘গুলদস্তা’-র মতো ছবির পাশাপাশি ‘পটল কুমার গানওয়ালা’-সহ একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে। ৮২ বছরেরও বেশি বয়সেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। সম্প্রতি নিজের জীবন অবলম্বনে তৈরি নাটক ‘ইতি ছন্দা’-র মাধ্যমে আবারও মঞ্চে ফিরেছেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে ছন্দা চট্টোপাধ্যায় জানান, তাঁর জন্ম এক বনেদি জমিদার পরিবারে। সেই সময় বাড়ির মেয়েদের বাইরে গিয়ে অভিনয় করা তো দূরের কথা, প্রকাশ্যে আসাটাই ছিল বড় নিষেধ। বাড়িতে যাত্রা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও পরিবারের মহিলারা আড়াল থেকে তা দেখতেন। তিনি বলেন, “আমাদের তো জমিদার পরিবার ছিল। বাড়ির মেয়েরা বাইরে যাবে, নাটক করবে এসব কেউ মেনে নিতে পারত না।” অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিবারের একাংশের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় তাঁকে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, তাঁর অভিনয়ে নামার সিদ্ধান্তে ঠাকুরদা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে তিনি নাকি বলেছিলেন, “ওকে গুলি করে মেরে দাও। ও বংশের কলঙ্ক।” সেই সময়ের সামাজিক মানসিকতা কতটা কঠোর ছিল, তাঁর এই স্মৃতিচারণেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে পরিবারের সবাই যে একইভাবে ভাবতেন, তা নয়। ছন্দা চট্টোপাধ্যায় জানান, তাঁর বাবা ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং অত্যন্ত উদার মানসিকতার মানুষ। তিনি কখনও মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। বরং সবসময় বিশ্বাস করতেন, “কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনও বাধা দেওয়া উচিত নয়।” বাবার এই সমর্থনই তাঁকে জীবনের কঠিন সময়ে সাহস জুগিয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ ছিঃ! নাবালিকার সঙ্গে চরম নোং’রামি! মানসিক এবং শারী’রিক হেন’স্থার অভিযোগে গ্রেফতার লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের ধারাবাহিকের নায়ক? পকসো আইনে মামলা, ফের আইনি বিপাকে বাঙালি চিত্রনাট্যকার-প্রযোজক?

আজ এত বছরের অভিনয় জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং সমাজের কুসংস্কার ও রক্ষণশীল মানসিকতার বিরুদ্ধে এক নারীর জয়গাথা। যে মেয়েকে একদিন ‘বংশের কলঙ্ক’ বলা হয়েছিল, তিনিই পরবর্তীকালে বাংলা অভিনয় জগতের অন্যতম সম্মানিত শিল্পী হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে সমস্ত বাধা অতিক্রম করেই নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। তাঁর এই সংগ্রামের গল্প আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

You cannot copy content of this page