বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে নির্মলা মিশ্র এমন এক নাম, যাঁর কণ্ঠে অসংখ্য গান আজও সমান জনপ্রিয়। বাংলা, ওড়িয়া-সহ একাধিক ভাষায় গান গেয়ে তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা নির্মলা মিশ্র পরবর্তীকালে একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দেন। তাঁর কণ্ঠে “ও তোতা পাখি রে”, “তোমার আকাশ দুটি চোখে”, “আজ কোনও কাজ নেই” কিংবা “এমন একটি ঝিনুক” আজও বাঙালির নস্টালজিয়ার অংশ। ২০২২ সালের ৩১ জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রয়াত হলেও তাঁর গান আজও সমানভাবে মানুষের মনে বেঁচে রয়েছে। তবে তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলির একটিকে ঘিরেই লুকিয়ে রয়েছে এক চমকপ্রদ ঘটনা।
ব্যক্তিগত জীবনেও নির্মলা মিশ্র ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং চঞ্চল স্বভাবের মানুষ। সেই কারণেই তাঁর ডাকনাম ছিল “ঝামেলা”। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁদের অনেকেই বলতেন তিনি সবসময় প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকতেন। গানের ক্ষেত্রেও তাঁর আলাদা পছন্দ ছিল। বিশেষ করে দ্রুত লয়ের গান গাইতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। তাই একসময় যখন তাঁর হাতে একটি ধীর লয়ের নতুন গান তুলে দেওয়া হয়, তখন সেটি নিয়ে তিনি মোটেই উৎসাহী ছিলেন না। বরং শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, এমন ধীর গতির গান তিনি গাইতে চান না।
সেই গানটি ছিল “এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না”। দুর্গাপুজোর জন্য গানটির কথা লিখেছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুর করেছিলেন সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষ। কিন্তু গানটি হাতে পেয়েই নির্মলা আপত্তি জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, এত ধীর লয়ের গান মঞ্চে কেউ শুনতে চাইবেন না। তাই তিনি এই গান রেকর্ড করতে রাজি হননি। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় নচিকেতা ঘোষকে জানিয়ে দেন, নির্মলার জন্য তিনি আর অন্য কোনও গান লিখবেন না। প্রয়োজনে অন্য কোনও গীতিকারের কাছে যেতে পারেন।
এরপরও নির্মলা মিশ্র নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। এমনকি নচিকেতা ঘোষের মায়ের কাছেও বিষয়টি নিয়ে অনুরোধ করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু তাতেও কোনও লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত নচিকেতা ঘোষ তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “এই গান যদি না গাও, তাহলে আমি আর কোনওদিন তোমাকে গান শেখাব না।” প্রিয় গুরুর এই কঠোর অবস্থানের পর আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। বাধ্য হয়েই নির্মলা মিশ্র গানটি রেকর্ড করেন। তখন হয়তো তিনি নিজেও ভাবতে পারেননি, যে গানটি গাইতে এত আপত্তি ছিল, সেটিই একদিন তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম বড় পরিচয় হয়ে উঠবে।
আরও পড়ুনঃ ‘মায়ের সামনেই আমায় কু*প্রস্তাব দেয়, তারপর…’ ‘আমি অভিনয় করতে এসেছি, নিজেকে বেচতে বা অস’ভ্যতামি করতে আসিনি!’ ‘পাইনি মানেই রাজনীতির জন্য বসিয়ে রেখেছে’ এই যুক্তি মানতে নারাজ, বরং পেয়ে কাজ ফিরিয়ে দেওয়া ক্ষমতা রাখেন এমিলা ভট্টাচার্য! ছোটবেলায় ধারাবাহিকে কাজ করতে গিয়ে কী ঘটেছিল তাঁর সঙ্গে? অত্যন্ত অশা’লীন ও অপমা’নজনক সেই অভিজ্ঞতার কথা অকপটে ভাগ করলেন অভিনেত্রী?
গানটি প্রকাশের পরই শ্রোতাদের বিপুল ভালোবাসা পায় এবং বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে জায়গা করে নেয়। পরবর্তী সময়ে বৃদ্ধ বয়সে এই ঘটনার কথা স্মরণ করে নির্মলা মিশ্র নিজেই হাসতে হাসতে সেই স্মৃতি ভাগ করে নিতেন। যে গানকে একসময় তিনি মঞ্চে জনপ্রিয় হবে না বলে মনে করেছিলেন, সেই গানই তাঁকে অমর করে রাখে বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে। আজও “এমন একটি ঝিনুক” শুনলেই শ্রোতাদের মনে ভেসে ওঠে নির্মলা মিশ্রের সেই অনন্য কণ্ঠ, যা সময় পেরিয়েও একইভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হয়।






