বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট অভিনেতা ও নাট্যপরিচালক চন্দন সেন বহুদিন ধরেই শুধু অভিনয়ের জন্য নয়, তাঁর মানবিক কাজের জন্যও পরিচিত। মঞ্চে ও পর্দায় সমান দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি তিনি বরাবরই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের উপার্জনের বড় অংশ থিয়েটার এবং সমাজসেবামূলক কাজে খরচ করেছেন, দুঃস্থ মানুষদের সাহায্য করেছেন নিঃশব্দে। কিন্তু জীবনের এক কঠিন সময়ে তিনি নিজেই যখন অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছিলেন, তখন মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা তাঁর জীবনের ভাবনাকেই বদলে দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বলেন, “যেদিন নিজে থেকে মনে করব আমি আর পাঁচটা মানুষের কাজে লাগছি না, সেই দিন আমার মনে হবে আমার আর বেঁচে থাকার কোনও কারণ নেই।”
এই কথার পেছনে রয়েছে গভীর এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থতার সময় চন্দন সেন দীর্ঘদিন বাড়িতে বন্দি ছিলেন। বড় অপারেশন, দীর্ঘ চিকিৎসা সব মিলিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সেই সময় তিনি একা ছিলেন না। তাঁর কথায়, “একটা দিনও যায়নি যেদিন কেউ না কেউ আমার কাছে আসেনি।” প্রতিদিন কেউ এসে পাশে বসেছেন, কথা বলেছেন, সময় দিয়েছেন, এই উপস্থিতিই তাঁকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠার শক্তি জুগিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মানুষ তাঁর কাছে শুধু অর্থসাহায্য নিয়ে আসেননি, বরং উল্টো কথা বলেছেন। চন্দন সেন জানান, অনেকেই তাঁকে বলেছেন, টাকা দেওয়ার থেকে তিনি যেন নিজে সময় দেন, সেটাই তাদের কাছে অনেক বেশি মূল্যবান। তিনি বলেন, “আমাকে অনেকে বলেছে, আপনি টাকা দেবেন না, আপনি একদিন এসে একটা বই পড়ে শোনান, একটু হাঁটতে নিয়ে যান, সেটাই যথেষ্ট।” এই কথাগুলোই তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন, মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া অর্থ নয়, বরং পাশে থাকা, সময় দেওয়া এবং মানসিক সমর্থন।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই চন্দন সেন নিজের জীবনের দর্শন আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, একজন মানুষের বেঁচে থাকার আসল মানে তখনই, যখন সে অন্য মানুষের কাজে লাগে। তিনি বলেন, “আমি এখনও বাতিল হয়ে যাইনি, আমি আছি, এবং আমি কাজ করতে পারি, মানুষের পাশে থাকতে পারি।” তাঁর কাছে জীবন মানে শুধু নিজের সাফল্য নয়, বরং অন্যের জীবনে একটু হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারা। তাই তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেন, মানুষ যেন মানুষের পাশে দাঁড়ায় শুধু অর্থ দিয়ে নয়, নিজের উপস্থিতি দিয়ে।
চন্দন সেনের এই বক্তব্য আজকের সময়ে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে অনেক সময় সাহায্য মানেই শুধু অর্থসাহায্য বলে মনে করা হয়, সেখানে তিনি মনে করিয়ে দেন, মানুষের কাছে সময় দেওয়া, কথা বলা, পাশে থাকা অনেক বড় বিষয়। তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা যেন সেই কথাই নতুন করে সামনে আনে। আর তাই তাঁর সেই কথাটাই যেন সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যতদিন তিনি অন্য মানুষের কাজে লাগতে পারবেন, ততদিনই তাঁর বেঁচে থাকার অর্থ আছে।






