কণ্ঠ ছিল স্বর্গীয়, তবু আজীবন বঞ্চ’নার শি কার! যে গান শুনে সবাই ভাবতেন লতা মঙ্গেশকর, সেই কণ্ঠের মালিকই রয়ে গেলেন আড়ালে! কেন সুমন কল্যাণপুরকে বলা হয় ‘অদৃশ্য কিংবদন্তি’? গতকাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন সঙ্গীতশিল্পী, জানুন তাঁর বেদনাভরা জীবন ও না-পাওয়ার দীর্ঘ গল্প!

রেডিওর পুরনো দিনের অনেক জনপ্রিয় গান আজও শ্রোতাদের মনে একইরকম আবেগ জাগায়। সেইসব গানের মধ্যে “আমার স্বপ্ন দেখা দুটি নয়ন হারিয়ে গেল কোথায় কখন” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আশ্চর্যের বিষয়, এই গান শুনে বহু মানুষ বছরের পর বছর ভেবেছেন এটি লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া। অথচ গানটির আসল শিল্পী ছিলেন সুমন কল্যাণপুর। রবিবার মুম্বইয়ের লোখান্ডওয়ালায় নিজের বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বর্ষীয়ান গায়িকা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বয়সজনিত নানা সমস্যার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর প্রয়াণের খবরে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে তাঁর নাম খুব বেশি পরিচিত না হলেও, তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান এখনও সমানভাবে জনপ্রিয়।

জন্মসূত্রে তিনি বাঙালি ছিলেন না, তবে তাঁর জীবনের সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির একটি গভীর যোগ তৈরি হয়েছিল। ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন সুমন হেমাদি। তাঁদের আদি নিবাস ছিল কর্নাটকের উদুপি জেলায়, তবে বাবার চাকরির সূত্রে পরিবার তখন ঢাকায় বসবাস করত। ১৯৪৩ সালে তাঁরা বম্বেতে চলে যান। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ভাষার পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে কন্নড়, মারাঠি, হিন্দি এবং বাংলার উপর সমান দক্ষতা তৈরি হয়েছিল তাঁর। পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্রকলার প্রতিও ছিল গভীর আগ্রহ, সেই কারণে ভর্তি হয়েছিলেন জেজে স্কুল অফ আর্টসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সঙ্গীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়। সঙ্গীত পরিচালক কেশব রাও ভোলে তাঁর প্রতিভা চিনে নিয়ে প্লেব্যাক গানের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন।

১৯৫৪ সালে ‘মঙ্গু’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু হয় সুমন কল্যাণপুরের। এরপর ধীরে ধীরে বলিউডের প্রথম সারির সঙ্গীত পরিচালক ও শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। তালাত মাহমুদ, শঙ্কর-জয়কিষণ, এস ডি বর্মন, মদন মোহন এবং নৌশাদের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। ব্যবসায়ী রামানন্দ কল্যাণপুরকে বিয়ে করার পর তাঁর কেরিয়ার আরও শক্ত ভিত পায়। স্বামীর পূর্ণ সমর্থন তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। তবে সেই সময় হিন্দি গানের জগতে লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের দাপট ছিল সর্বাধিক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সুমনের কণ্ঠ লতার সঙ্গে এতটাই মিল ছিল যে অনেক সময় শ্রোতারাও বিভ্রান্ত হয়ে যেতেন। এমনকি রেডিওতে তাঁর গান বাজলেও অনেকেই সেটিকে লতার গান বলে ধরে নিতেন।

এই কণ্ঠস্বরের মিলই একদিকে তাঁকে পরিচিতি দিলেও, অন্যদিকে তাঁর নিজস্ব পরিচয়কে অনেক সময় আড়াল করে দেয়। ইন্ডাস্ট্রির একাংশ তাঁকে প্রায়ই বিকল্প হিসেবে দেখত। লতা কোনও গানে সময় দিতে না পারলে বা প্রযোজকের পক্ষে তাঁর পারিশ্রমিক বহন করা কঠিন হলে ডাক পড়ত সুমনের। তবুও নিজের প্রতিভার জোরে তিনি একাধিক স্মরণীয় কাজ উপহার দিয়েছেন। বিশেষ করে মহম্মদ রফির সঙ্গে রয়্যালটি বিতর্কের সময় লতার বদলে সুমনই রফির সঙ্গে প্রায় ১৪০টি ডুয়েট গান গেয়েছিলেন। সেই তালিকায় “আজকাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে” আজও শ্রোতাদের প্রিয়। বাংলাতেও তাঁর প্রতিভার মূল্য দিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দে। তাঁদের উদ্যোগেই ‘মণিহার’, ‘কৃষ্ণ সুদামা’ সহ একাধিক ছবিতে তাঁর কণ্ঠ শোনা গিয়েছে। “তোরা হাত ধর প্রতিজ্ঞা কর” গানটিও তাঁর কণ্ঠে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ “শর্ট টার্ম মেমরি লস এখন ওর সঙ্গী” প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছেন স্যান্ডি, কিন্তু আর হয়ত কোনওদিন ফিরতে পারবেন না প্রিয় পেশায়! মৃ’ত্যুর মুখ থেকে ফিরে বর্তমানে কেমন আছেন টলিউডের একসময়ের জনপ্রিয় স্টাইলিস্ট সন্দীপ ঘোষাল?

ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথচলায় কখনও নিজেকে অন্য কারও মতো প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি সুমন কল্যাণপুর। কিন্তু কণ্ঠস্বরের স্বাভাবিক মিলের কারণে তিনি বারবার তুলনার মুখে পড়েছেন। আশা ভোঁসলে যেমন নিজের আলাদা ধারা তৈরি করেছিলেন, সেই সুযোগ বা প্রচারের সুবিধা সুমনের ভাগ্যে খুব বেশি জোটেনি। তবুও পাঁচ, ছয় এবং সত্তরের দশকে একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। ‘বাত এক রাত কি’, ‘দিল এক মন্দির’, ‘দিল হি তো হ্যায়’, ‘জাহান আরা’ এবং ‘পাকিজা’র মতো ছবিতে তাঁর গাওয়া গান আজও সমাদৃত। বাংলা আধুনিক গানেও “মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে” এবং “আমার স্বপ্ন দেখা দুটি নয়ন” বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। জীবনের শেষ পর্বে তিনি লতা মঙ্গেশকর পুরস্কারেও সম্মানিত হন। তবে সব পুরস্কারের ঊর্ধ্বে তাঁর আসল পরিচয়, তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর কণ্ঠ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

You cannot copy content of this page