“আমাকে দু’বার হাসপাতালে যেতে হয়েছিল” ‘জন্মভূমি’ নিয়ে চমকে দেওয়া স্মৃতিচারণ ‘পিসিমা’ মিতা চ্যাটার্জির! সাত বছরের সেই সফল যাত্রার নেপথ্যে লুকিয়ে কোন অজানা ক’ষ্টের গল্প? ধারাবাহিক ঘিরে কেন বারবার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল বর্ষীয়ান অভিনেত্রীকে?

বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই দর্শকদের মনে ভেসে ওঠে এক বিশেষ চরিত্রের মুখ। সেই তালিকায় অন্যতম নাম মিতা চ্যাটার্জী। বাংলা চলচ্চিত্র, থিয়েটার, যাত্রাপালা এবং টেলিভিশনের এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী কয়েক দশক ধরে নিজের অভিনয় দক্ষতায় দর্শকদের মুগ্ধ করে এসেছেন। বিশেষ করে দূরদর্শনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘জন্মভূমি’-র ‘পিসিমা’ চরিত্র তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে। আজও বহু দর্শক তাঁকে নিজের নামের চেয়ে ‘পিসিমা’ হিসেবেই বেশি মনে রাখেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছেন তিনি।

১৯৩৬ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মিতা চ্যাটার্জী। তাঁর আসল নাম ছিল নমিতা চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়ের পরিবেশেই বড় হয়ে ওঠা মিতার বাবা ফণিভূষণ চট্টোপাধ্যায়ও অভিনয় ও যাত্রাজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় তাঁর। শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করে ধীরে ধীরে থিয়েটার, সিনেমা এবং টেলিভিশনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। স্টার থিয়েটারের স্বর্ণযুগ থেকে শুরু করে বাংলা যাত্রাপালার জনপ্রিয় মঞ্চ সব জায়গাতেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এই অভিনেত্রী। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠস্বরও দর্শকদের কাছে সমান জনপ্রিয় ছিল।

তবে তাঁর অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হয়ে ওঠে ‘জন্মভূমি’ ধারাবাহিক। সম্প্রতি সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, প্রথমে তাঁকে মাত্র ছয় দিনের শুটিংয়ের জন্য ডাকা হয়েছিল। তখন তিনি নিজেও ভাবেননি যে সেই চরিত্রই পরবর্তীকালে তাঁকে অমর করে তুলবে। তাঁর কথায়, দৃঢ়তা, নিষ্ঠা এবং দর্শকের ভালোবাসা থাকলে ছয় দিনের কাজও সাড়ে সাত বছরের যাত্রায় পরিণত হতে পারে। তিনি মনে করেন, এর পিছনে ঈশ্বরের আশীর্বাদও ছিল। কারণ শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন তাঁর চরিত্রটি কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু দর্শকদের বিপুল ভালোবাসা এবং জনপ্রিয়তার কারণে ধারাবাহিকের নির্মাতারা বারবার তাঁর চরিত্রটিকে গল্পে ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

সাক্ষাৎকারে মিতা চ্যাটার্জী আরও জানান, ধারাবাহিক চলাকালীন একাধিকবার গল্পের প্রয়োজনে তাঁর চরিত্রকে হাসপাতালের বেডে পাঠানো হয়েছিল। তিনি হাসতে হাসতেই বলেন, নির্মাতারা ভেবেছিলেন হয়তো এবার তাঁর চরিত্রকে সরিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটত। যতবারই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি দেখানো হয়েছে, ততবারই দর্শকদের আগ্রহ বেড়েছে এবং ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তাও অটুট থেকেছে। অভিনেত্রীর কথায়, তাঁকে দু’বার হাসপাতালের দৃশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শুটিংয়ের সময় বিভিন্ন শারীরিক কষ্টও সহ্য করতে হয়েছে। ছোট জায়গায় দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকা, বারবার একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি সবকিছুই করতে হয়েছে পেশাদারিত্বের খাতিরে। কিন্তু দর্শকদের ভালোবাসা সেই কষ্টকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ ১০ বছরের দাম্পত্য আজও অটুট, বিয়ের আগেই হবু স্ত্রী মধুবনীর কোন বিশেষ গুণ দেখে প্রেমে পড়েছিলেন রাজা? অবশেষে নিজের মুখেই ফাঁস করলেন অভিনেতা!

আজ বহু বছর পেরিয়ে গেলেও ‘জন্মভূমি’-র ‘পিসিমা’ চরিত্র এখনও বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় নাম। মিতা চ্যাটার্জীর কথায়, একজন শিল্পীর কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না যে দর্শক তাঁকে নিজের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে মনে রাখে। অভিনয় জীবনের অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে ‘পিসিমা’ই তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই এত বছর পরেও মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে, ভালোবেসেছে এবং তাঁর কাজকে সম্মান জানিয়ে চলেছে। দর্শকদের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসাকেই তিনি তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার বলে মনে করেন।

You cannot copy content of this page