“এই তুই এমপি হবি, আমি এমএলএ হব… এটা কি ছেলে খেলা?” “আগে শিল্পীদের মানুষ সম্মান করত, এখন কাদা ছুঁড়ছে…লোকে বাংলা সিনেমা দেখতে যাচ্ছে না, ঘেন্নায় যাচ্ছে না!” বাড়ছে অনীহা, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দর্শক! নেপথ্যে কি শিল্পীদের একাংশের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড? সরাসরি প্রশ্ন তুলে কাদের ধুয়ে দিলেন ভাস্কর ব্যানার্জি?

বিনোদন জগতের তারকাদের কাছে শুধু অভিনয় নয়, ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও নানা অভিজ্ঞতা ও মতামত থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে দর্শকদের ভাবনা, শিল্পীদের অবস্থান এবং বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কর্মপরিবেশ। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেই অন্দরমহলের নানা অজানা কথা উঠে আসে দর্শকদের সামনে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বাংলা বিনোদন জগতের বর্তমান পরিস্থিতি, শিল্পীদের রাজনীতিতে যোগদান এবং বাংলা সিনেমার প্রতি দর্শকদের অনীহা নিয়ে অকপটে মুখ খুললেন অভিনেতা ভাস্কর ব্যানার্জি। তাঁর একাধিক মন্তব্য ইতিমধ্যেই চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

বাংলা চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ ভাস্কর ব্যানার্জি। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয় জীবনে ছোটপর্দা, বড়পর্দা, যাত্রা এবং ওটিটি বিভিন্ন মাধ্যমে নিজের অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখেছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনেও অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা। মেট্রো, অটো কিংবা ওলা-উবারে যাতায়াত করতে তাঁর কোনও দ্বিধা নেই। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবন থেকে শুরু করে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে দেখা যায় তাঁকে। বাংলা সিনেমার প্রতি দর্শকদের অনীহার প্রসঙ্গে ভাস্কর ব্যানার্জির মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

অভিনেতার কথায়, “লোকে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে না, ঘেন্নায় যাচ্ছে না, আর কিছু না।” তাঁর মতে, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থার নেপথ্যে শুধুমাত্র ভালো ছবির অভাব নয়, শিল্পীদের একাংশের কর্মকাণ্ডও দায়ী। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের কাছে শিল্পীদের যে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দর্শকদের একাংশ এখন আর শিল্পীদের আগের মতো শ্রদ্ধার চোখে দেখেন না, যার প্রভাব পড়ছে বাংলা সিনেমার উপরও। ইন্ডাস্ট্রির এই পরিস্থিতির জন্য রাজনীতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ভাস্কর ব্যানার্জি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “রাজনীতি করেই তো ইন্ডাস্ট্রির এই অবস্থা হল।”

অভিনেতার দাবি, কিছু শিল্পী রাজনীতিতে গিয়ে এমন কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেছেন, যার জন্য গোটা শিল্পী সমাজের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাঁর কথায়, “আগে শিল্পীদের মানুষ কত সম্মান করত! আজকে রাজনীতিতে গিয়ে কিছু কিছু মানুষ এমন এক একটা কাণ্ড করেছে যে মানুষ এখন শিল্পীদের খুব খারাপ চোখে দেখে।” তিনি আরও বলেন, একজন বা দু’জনের ভুলের মাশুল অনেক সময় পুরো ইন্ডাস্ট্রিকেই দিতে হয়। শিল্পীদের রাজনীতিতে যোগদান প্রসঙ্গে ভাস্কর ব্যানার্জির বক্তব্য ছিল আরও কড়া। তিনি বলেন, “পলিটিক্স না বুঝে প্র্যাকটিস করতে যাওয়া মানে খেলতে না জেনে মাঠে নেমে পড়া।”

তাঁর মতে, রাজনীতি কোনও ‘ছেলেখেলা’ নয়। একজন পেশাদার রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে নিজের জায়গা তৈরি করেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “এই তুই এমপি হবি, আমি এমএলএ হব, আমি কাউন্সিলর হব এটা কি ছেলে খেলা হচ্ছে নাকি?” ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তার মোহে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রবণতাকে তিনি কার্যত কটাক্ষ করেছেন। অভিনেতার মতে, প্রত্যেক মানুষের নিজের কাজের জায়গায় থাকা উচিত। তিনি একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বলেন, “সুক্ত যদি সুক্তর জায়গায় যায়, চাটনি যদি চাটনির জায়গায় যায়, তাহলে খাওয়াটা ভালো হয়।” অর্থাৎ, শিল্পীদের শিল্পচর্চাতেই মনোনিবেশ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

তাঁর বক্তব্য, যে কাজের জন্য একজন শিল্পী মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান অর্জন করেছেন, সেই কাজকেই প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, দর্শকদের সঙ্গে শিল্পীদের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। শুধু ইন্ডাস্ট্রির সংকট নয়, শিল্পীদের সামাজিক ভাবমূর্তি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভাস্কর ব্যানার্জি। তাঁর মতে, একসময় কোনও শিল্পীকে দেখলে দর্শকদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস ও সম্মানের অনুভূতি তৈরি হত, বর্তমানে তার অনেকটাই কমে গিয়েছে। কিছু বিতর্কিত ঘটনার জেরে গোটা শিল্পী সমাজকে একসঙ্গে বিচার করা হচ্ছে, যা কোনওভাবেই কাম্য নয়। যদিও তিনি এও মনে করেন যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

আরও পড়ুনঃ ‘নিশ্চিন্ত আমি এবার…’ গো-মাং*সের জোগান নেই, পার্ক স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী অলিপাবের মেনু থেকেই বাদ বিখ্যাত বিফ স্টেক! কয়েকমাস আগে নেটপাড়ায় তীব্র বিত’র্কের পর এবার বদলেছে পরিস্থিতি, মুখ খুললেন সায়ক চক্রবর্তী! কী বললেন তিনি?

তবে সমস্ত সমালোচনার মাঝেও বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। তাঁর বিশ্বাস, প্রত্যেকে যদি নিজের নিজের কাজের জায়গায় ফিরে আসেন এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন, তাহলে বাংলা সিনেমা এবং বাংলা বিনোদন জগত আবারও তার হারানো সম্মান ফিরে পাবে। দর্শকরাও আবার নতুন করে বাংলা ছবির উপর আস্থা রাখতে শুরু করবেন। শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং পেশার প্রতি সম্মানই পারে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে এমনটাই মনে করেন ভাস্কর ব্যানার্জি।

You cannot copy content of this page