“সব সঞ্চয় শেষ….এখন মানুষের ভালোবাসাতেই বেঁচে আছি”— দাবি চন্দন সেনে’র! মারণ রোগ ক্যা’ন্সা’রের সঙ্গে লড়াইয়েই কী শেষ হয়ে গেছে জীবনের সব পুঁজি? কেন আজও আর্থিক অনিশ্চয়তায় জনপ্রিয় বাঙালি শিল্পী—প্রশ্নের মুখে শিল্পজগতের নি’র্মম বাস্তবতা!

শিল্পীদের জন্য মঞ্চের আলো কোন সময় নিভে গেলেও, তখনও কিছু মানুষ থাকে যাদের কথা সমাজ পরিবর্তনে সাহায্য করে। বাংলা থিয়েটার আর সিনেমার পরিসরে এমনই এক পরিচিত মুখ চন্দন সেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নাটক, চলচ্চিত্র এবং নির্দেশনায় নিজের স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু সাফল্যের বাইরের জীবনটা কেমন? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁর মুখে শোনা গেল এমন কিছু কথা, যা শিল্পীর জীবনের এক অন্য বাস্তবতাকে সামনে এনে দিল।

সেই ভিডিও সাক্ষাৎকারেই অকপটে তিনি বলেন, তাঁর কোনও সঞ্চয় নেই। মানুষের ভালোবাসাই তাঁর মূল ভরসা। কথাগুলো বলার সময় কোনও নাটকীয়তা ছিল না, ছিল একরাশ সহজ স্বীকারোক্তি। আমরা সাধারণত ধরে নিই, দীর্ঘদিন অভিনয় জগতে থাকলে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা যেন সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শিল্পচর্চা সবসময় অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার সমান নয়।

এই স্বীকারোক্তির পেছনে রয়েছে কঠিন ব্যক্তিগত লড়াইও। একসময় ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসা, কেমোথেরাপি এবং শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও মনোবল হারাননি। সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরেছেন, মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন, ক্যামেরার সামনে অভিনয় করেছেন। তবে অসুস্থতার দীর্ঘ সময় তাঁর আর্থিক অবস্থাকে নড়বড়ে করে দেয়। সেই সময়ে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই পাশে দাঁড়ালেও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা খুব একটা মেলেনি—এ কথাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন তিনি।

অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বহু কাজ করেও প্রত্যাশিত পারিশ্রমিক সবসময় মেলেনি। তাঁর কথায়, তিনি কর্পোরেট দুনিয়ার মানুষ নন; তিনি শিল্পী। শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই কাজ করেছেন, কিন্তু শিল্পীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা এখনও অপ্রতুল। তাঁর এই মন্তব্যে বাংলা বিনোদন জগতের এক নীরব সংকটের ইঙ্গিত মেলে—যেখানে পরিচিত মুখ হয়েও অনেকেই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটান।

আরও পড়ুনঃ “এখন দুই-তিনজন মানুষকে নিয়ে পরিবার…রূপকথার গল্প বলা ঠাকুমা-দিদিমাদেরও পাওয়া যায় না, বাচ্চারা সঠিক মূল্যবোধ পাচ্ছে না!” বাড়িতে মানুষ কম, ঘর বেশি! যৌথ পরিবার ভাঙনের প্রভাবে নতুন প্রজন্মের মানসিক বদল নিয়ে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের আক্ষেপ!

চন্দন সেনের এই খোলা বক্তব্য আসলে কেবল ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়। এটি আমাদের ভাবায়—জনপ্রিয়তা আর আর্থিক স্বস্তি এক জিনিস নয়। যাঁরা আমাদের বিনোদন দেন, হাসান-কাঁদান, তাঁদের জীবনও অনিশ্চয়তায় ভরা হতে পারে। মানুষের ভালোবাসাকেই যদি মূল পুঁজি বলে মনে করতে হয়, তবে সেই ভালোবাসার দায়ও কি আমাদের নয়? শিল্পীর এই সরল স্বীকারোক্তি তাই শুধু খবর নয়, সমাজের কাছে এক নীরব প্রশ্ন।

You cannot copy content of this page