বিনোদন জগতের ঝলমলে আলো আর পর্দার পিছনে লুকিয়ে থাকে শিল্পীদের জীবনের নানা লড়াই, না পাওয়া এবং একাকিত্বের গল্প। একসময় যাঁদের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাই কখনও হারিয়ে যান প্রচারের আলো থেকে। কাজের সুযোগ, পরিচিতি কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে কমে আসে। বাংলা বিনোদন জগতের এমনই এক অভিনেতা জর্জ বেকার। একসময় যাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছিল, আজ তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতেই সময় কাটাচ্ছেন। কেমন আছেন এই অভিনেতা? কীভাবে কাটছে তাঁর বর্তমান জীবন?
জর্জ বেকার নামটির সঙ্গে বাংলা সিনেমার দর্শকদের অনেকেই পরিচিত। বিশেষ করে ব্রিটিশ সাহেবের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল বেশ নজরকাড়া। পর্দায় বারবার বিদেশি চরিত্রে অভিনয় করলেও তিনি আদতে একজন ভারতীয়। বাংলা ছাড়াও অসমিয়া, হিন্দি, ইংরেজি এবং সাঁওতালি ভাষার ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি যাত্রা ও টেলিভিশনের জগতেও নিজের অভিনয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি একসময় সক্রিয় রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন এই অভিনেতা।
১৯৪৫ সালের ২৮ অক্টোবর অসমের তেজপুরে একটি গ্রিক পরিবারে জন্ম জর্জ বেকারের। লখনউয়ের লা মার্টিনিয়ার কলেজে তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলেন তিনি। মুষ্টিযুদ্ধ ও সাঁতারে জুনিয়র জাতীয় স্তরে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অসম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনা শুরু করলেও বাবা-মায়ের মৃত্যুর কারণে মাঝপথে তা ছেড়ে দিতে হয়। এরপর রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চাকরি শুরু করেন। তবে অভিনয়ের জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে অসমিয়া ছবি ‘চামেলি মেমসাহেব’-এর হাত ধরে। ছবিতে ব্রিটিশ প্ল্যান্টার বাকটে চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিল। পরে ছবিটির বাংলা সংস্করণেও একই চরিত্রে অভিনয় করেন জর্জ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘পরিণীতা’ এবং ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। বিশেষ করে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এ মিস্টার রামসে চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটেছিল।
তবে বর্তমানে অভিনয়ের জগৎ থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছেন এই অভিনেতা। সম্প্রতি নিউটাউনের নিজের বাড়ির বেসমেন্টে পড়ে গিয়ে গুরুতর চোট পান তিনি। ভেঙে যায় তাঁর দুটি হাড়। সেই দুর্ঘটনার পর থেকেই তিনি শয্যাশায়ী এবং চিকিৎসা ও বিশ্রামের মধ্যে রয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে রয়েছেন স্ত্রী অর্পিতা বেকার। একসময়ের অভিনেত্রী অর্পিতাই এখন স্বামীর দেখভাল করছেন। দীর্ঘদিন ধরে কোনও নতুন ছবিতে দেখা যায়নি জর্জকে। কাজের সুযোগ না পাওয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়া নিয়ে তাঁর অভিমানের কথাও উঠে এসেছে। যদিও ভালো কাজের প্রস্তাব পেলে আবারও অভিনয়ের কথা ভাবতে পারেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ “মধ্যবিত্তের সবথেকে বড় সমস্যা অমনোযোগ!” নিজের বাবার টিভি দেখার অভ্যাসের উদাহরণ টেনে সমাজের কোন চেনা বাস্তবতা তুলে ধরলেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য? তাঁর কথায় কি নিজের অজান্তেই ধরা পড়ছে আমাদেরও চেনা স্বভাব?
একসময় অভিনয় ও রাজনীতি দুই ক্ষেত্রেই সক্রিয় থাকা জর্জ বেকার এখন অনেকটাই নিভৃতে জীবন কাটাচ্ছেন। বয়সের ভার এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে আপাতত রাজনীতিতেও ফেরার ইচ্ছা নেই তাঁর ও স্ত্রী অর্পিতার। এখন তাঁদের একমাত্র চাওয়া, সুস্থভাবে এবং শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটানো। একসময় পর্দায় যাঁর উপস্থিতি দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে, সেই অভিনেতার বর্তমান জীবনের খবর নিঃসন্দেহে পুরনো দিনের দর্শকদের মনে নানা স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে।






