সামনেই কালীপুজো। এই সময়কে ঘিরে বাঙালির নানা বিশ্বাস ও আচার রয়েছে। মনে করা হয়, মা কালীর সঙ্গে ভূতপ্রেতেরাও অনুচর হয়ে মর্ত্যে আসেন। তন্ত্রসাধনার ক্ষেত্রেও এই সময়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। এই বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভিনেত্রী ও সঞ্চালিকা সুদীপা চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজোও। তাঁর দাবি, দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজোর সময় প্রতি বছরই তাঁদের বাড়িতে অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতা হয়। এমনকি এই সময় বাড়ির ছাদে একা বসতেও ভয় পান তিনি। নিজের এই অভিজ্ঞতার কথাই সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন সুদীপা। তাঁর কথায়, এই সময় ছাদে বসলেও শরীর যেন ভারী হয়ে আসে। বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের অনুভূতি হওয়ার কারণেই বিষয়টি তাঁদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
সুদীপার বাড়িতে গত ষোলো বছর ধরে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। তবে তাঁদের পুজোর নিয়মও বেশ আলাদা। ষষ্ঠীর দিন বৈষ্ণব মতে পুজো দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। সপ্তমীর দিন শিব আসেন বলে তখন থেকে শৈব মতে পুজো শুরু হয়। এর পর সন্ধিপুজো শেষ হলে দশমী পর্যন্ত তন্ত্র মতে পুজো করা হয়। সুদীপা জানিয়েছেন, তন্ত্র মতে পুজো শুরু হওয়ার পর থেকেই দেবীর মুখ-চোখ যেন বদলে যায়। সেই সময় থেকেই বাড়ির ছাদে একা বসা বন্ধ করে দেন পরিবারের সদস্যেরা। তাঁর দাবি, তন্ত্র মতে পুজো শুরু হওয়ার পর থেকে কালীপুজো পর্যন্ত এই নিয়ম মেনে চলা হয়। অর্থাৎ দুর্গাপুজোর শেষ পর্ব থেকেই তাঁদের বাড়ির পরিবেশে এক অন্য রকম পরিবর্তন অনুভব করেন তাঁরা।
এই রীতির পিছনেও রয়েছে তাঁদের পারিবারিক বিশ্বাস। সুদীপা জানিয়েছেন, তন্ত্র মতে পুজো শুরু হলে বিভিন্ন আত্মা মুক্তি পাওয়ার আশায় মায়ের চরণে এসে আশ্রয় নেন বলে তাঁদের বিশ্বাস। তাই সেই সময় থেকে পরিবারের কেউ আর দেবীর প্রতিমা স্পর্শ করেন না। প্রতিমার চারপাশ শিকল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়, যাতে কেউ সেখানে চলে যেতে না পারেন। শুধু পূজারী ব্রাহ্মণ এবং তাঁর সহকারীই মাকে স্পর্শ করতে পারেন। সুদীপার মতে, এর কারণও রয়েছে। যদি কোনও আত্মা দেবীর চরণে এসে আশ্রয় নিয়ে থাকে, তা হলে প্রতিমার কাছে গেলে তাঁদের গায়ে পা লাগতে পারে। এমনকি তাঁরা বিরক্তও হতে পারেন বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই কারণেই পুজোর সময় দেবী এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব রাখা হয়।
তবে সুদীপার কথায়, বিষয়টি শুধু প্রতিমার কাছেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এই পুজোর পর থেকে ভূতচতুর্দশী পর্যন্ত বাড়ির সদস্যেরা পূর্বপুরুষদের উপস্থিতি অনুভব করেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। ভূতচতুর্দশীর দিন চোদ্দো পুরুষের উদ্দেশে প্রদীপ দেওয়ার রীতি রয়েছে। সেই সময়ও একা ছাদে বসতে পারেন না পরিবারের কেউ।
সুদীপা জানিয়েছেন, ছাদে বসলেও শরীর ভারী হয়ে আসার মতো অনুভূতি হয়। বছরের পর বছর ধরে এমন অভিজ্ঞতা হয়ে আসছে বলেই দাবি অভিনেত্রীর। তাই এই সময়টায় বাড়ির সকলে বিশেষ কিছু নিয়ম মেনে চলেন। কালীপুজোর আগের দিন পারিবারিক রীতি মেনে পূজারী বাড়িতে আসেন। তিনি পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে চোদ্দোটি প্রদীপ দেন এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পুজো করেন।
আরও পড়ুনঃ “ওটা দেখেই আমার ভীষণ খারাপ লেগেছিল, যেখানে সারারাত জেগে প্র্যাকটিস করেছিলাম…” নন্দিনীর সঙ্গে অশান্তি বা কারোর সঙ্গে মনোমালিন্য নয়, তবে কোন ঘটনা দাগ কেটেছিল মনে? বিগ বস বাংলার ঘরে কীসের জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন সোহিনী পাল? অবশেষে সবটা জানালেন!
এর পর ধুনোর মতো কিছু জ্বালিয়ে পুরো ছাদ প্রদক্ষিণ করার রীতিও রয়েছে তাঁদের বাড়িতে। এই আচারের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়। তাঁদের বলা হয়, পরের বছর যখন আবার মা আসবেন, তখন যেন তাঁরা আবার ফিরে আসেন। অর্থাৎ দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজো পর্যন্ত সময়টা সুদীপার বাড়িতে শুধু উৎসবের নয়, নানা পারিবারিক বিশ্বাস ও আচারেরও সময়। ষোলো বছর ধরে সেই নিয়মেই দুর্গাপুজো হয়ে আসছে তাঁদের বাড়িতে। তন্ত্র মতে পুজো শুরু হওয়ার পর দেবীর মুখ-চোখ বদলে যাওয়া থেকে শুরু করে ছাদে একা বসলে গা ভারী হয়ে আসা, সবকিছুকেই এই সময়ের বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন সুদীপা। অশরীরী শক্তির অস্তিত্ব নিয়ে বিশ্বাস করা বা না করা ব্যক্তিগত বিষয় হলেও, নিজের বাড়িতে বছরের পর বছর ধরে এমন অনুভূতির কথাই জানিয়েছেন অভিনেত্রী। কালীপুজোর আগে তাই তাঁদের বাড়ির এই বিশেষ রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পূর্বপুরুষদের স্মরণও। প্রতি বছর নির্দিষ্ট নিয়মে তাঁদের বিদায় জানিয়ে পরের বছরের পুজোয় আবার ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়।






