বিনোদন জগতে এমন কিছু জুটি থাকেন, যাদের সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং একসঙ্গে পথচলার গল্প বছরের পর বছর ধরে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। দর্শক-শ্রোতারা শুধু তাঁদের কাজই নয়, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা গল্পও জানতে চান। বিশেষ করে যখন সেই জুটি নিজেদের প্রতিভা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং দীর্ঘ দাম্পত্যের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন, তখন তাঁদের জীবনকাহিনি আরও বেশি করে আলোচনায় উঠে আসে। বাংলা বাচিক শিল্পের জগতে এমনই এক জনপ্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় জুটি হলেন ঊর্মিমালা বসু ও জগন্নাথ বসু।
বাংলা আবৃত্তি, শ্রুতিনাটক এবং বাচিক শিল্পের সঙ্গে পরিচিত প্রায় প্রত্যেক মানুষের কাছেই পরিচিত নাম এই দম্পতি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা শুধু সংসারই করছেন না, পেশাগত ক্ষেত্রেও একে অপরের সবচেয়ে বড় সহযাত্রী হয়ে উঠেছেন। তাঁদের কণ্ঠ, উপস্থাপনা এবং মঞ্চে রসায়ন বহুদিন ধরেই শ্রোতাদের মুগ্ধ করে আসছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের সম্পর্কের শুরুর দিনের নানা অজানা স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন এই তারকা দম্পতি, যা নতুন করে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সাক্ষাৎকারে জগন্নাথ বসু জানান, রেডিওর জনপ্রিয় কণ্ঠ হিসেবে একসময় তিনি প্রচুর চিঠি পেতেন। সেই চিঠিগুলির মধ্যে অনেক ভক্তের লেখা থাকত, যেখানে নানা মজার প্রশ্নও করা হতো। কেউ জানতে চাইতেন, ছোটবেলায় তাঁর মা তাঁকে মধু খাইয়েছিলেন কি না, আবার কেউ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কৌতূহল প্রকাশ করতেন। তবে এত চিঠির ভিড়ে একটি বিষয় তাঁর বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল। তিনি বলেন, ঊর্মিমালা বসুর লেখা চিঠিগুলি ছিল অন্যরকম। সুন্দর কালো কালিতে লেখা, বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনা এবং পরিণত বক্তব্যে ভরা সেই চিঠিগুলি তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ধীরে ধীরে সেই চিঠির লেখককে না দেখেই তাঁর প্রতি এক বিশেষ টান অনুভব করতে শুরু করেন তিনি।
আরও পড়ুন: “আমি ওকে বকা দেই, তারপর বলি আবার তো পরে বলবি নিজের মা না!” সৎ ছেলেকে নিজের গর্ভজাত সন্তানের চেয়েও আগলে রাখেন কণীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়! দাম্পত্য জীবনে সম্পর্কের অন্দরমহলের গল্পে মন ছুঁলেন অভিনেত্রী! মা-ছেলের সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক কেমন? জানেন, অভিনেত্রীর ছেলে কত বড়?
এরপর একদিন সেই আকর্ষণই তাঁকে ঊর্মিমালার বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেয়। জগন্নাথ বসু জানান, তিনি তাঁর এক বন্ধু এবং ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঊর্মিমালার বাড়িতে গিয়েছিলেন। তবে সেই সাক্ষাৎ এতটা সহজ ছিল না। ঊর্মিমালার বাবা প্রথমদিকে এই সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা আপত্তি জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি জগন্নাথ বসুর আন্তরিকতাও যাচাই করতে চেয়েছিলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি জানান, অধ্যাপনার কাজের জন্য ঊর্মিমালাকে উত্তরবঙ্গে চলে যেতে হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে জগন্নাথ বসুর প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেটাই ছিল তাঁর দেখার বিষয়। সেই সময় জগন্নাথের উত্তর ছিল অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং ভালোবাসায় ভরা।
জগন্নাথ বসু স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি তখন স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে ঊর্মিমালা যদি উত্তরবঙ্গেও চলে যান, তবুও তিনি স্টাফরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করবেন। তাঁকে কে আটকাতে পারে, সেটাই তিনি দেখতে চান। সেই দৃঢ়তা এবং ভালোবাসার প্রকাশই শেষ পর্যন্ত সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রেম পরিণতি পায় দাম্পত্যে। আজ ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে পথ চলছেন ঊর্মিমালা বসু ও জগন্নাথ বসু। ব্যক্তিগত জীবনের মতোই পেশাগত ক্ষেত্রেও তাঁরা হয়ে উঠেছেন এক অনন্য জুটি। তাঁদের এই দীর্ঘ প্রেম, বিশ্বাস এবং সঙ্গীসুলভ সম্পর্ক আজও নতুন প্রজন্মের কাছে ভালোবাসার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে।






