অনীক দত্ত আর নেই, কিন্তু তাঁর বহু দিনের আক্ষেপ, বহু বছরের অপেক্ষা এবং এক অসমাপ্ত স্বপ্ন যেন অবশেষে পূরণ হল তাঁর মৃত্যুর পর। ‘অপরাজিত’ ছবিটি ২০২২ সালে নন্দনে প্রদর্শনের অনুমতি পায়নি, সেই ছবিই এবার প্রদর্শিত হল নন্দনের পর্দায়। ৫ জুন নন্দনে অনিক দত্তকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘অপরাজিত’ প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। আর সেই মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না ছবির প্রধান অভিনেতা জিতু কমল। নন্দনের অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে নিজের অভিনীত ছবিকে প্রদর্শিত হতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
নন্দনে নিজের ছবি মুক্তি পাওয়া প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্র পরিচালকেরই স্বপ্ন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে নন্দনের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। অনিক দত্তও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু ২০২২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অপরাজিত’ ছবিটি নানা বিতর্কের জেরে নন্দনে স্থান পায়নি। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। অনেকের মতে, ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পোস্টার অপসারণ নিয়ে প্রতিবাদের জেরেই ছবিটি নন্দনে প্রদর্শনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। যদিও ছবিটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছিল, তবুও নন্দনের দরজা তার জন্য খুলে যায়নি।
সময়ের সঙ্গে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে, বদলেছে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেরও অনেক সমীকরণ। সেই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই এবার নন্দনে প্রদর্শিত হল ‘অপরাজিত’। শুধু এই ছবিই নয়, অনিক দত্ত পরিচালিত আরও একটি জনপ্রিয় ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’-ও প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের একাংশ মনে করছেন, এটি শুধু একটি সিনেমার প্রদর্শনী নয়, বরং একজন নির্মাতার প্রতি দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতীকী স্বীকৃতি। তবে এই স্বীকৃতি যে অনেক দেরিতে এল, সেই আক্ষেপও সমানভাবে শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
‘অপরাজিত’ ছবিতে কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জিতু কমল। ছবিটি মুক্তির সময় থেকেই তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু নন্দনে ছবিটি প্রদর্শিত না হওয়ার কষ্ট তাঁর মনেও ছিল। তাই তিন বছর পর সেই একই ছবি যখন নন্দনের পর্দায় উঠল, তখন আবেগ সামলাতে পারেননি অভিনেতা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তিনি জানান, দর্শকদের বিপুল সাড়া এবং নন্দনের হাউসফুল প্রেক্ষাগৃহ যেন প্রমাণ করে দিয়েছে মানুষ ছবিটিকে কতটা ভালোবেসেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ২০২২ সালেই যদি ছবিটি নন্দনে প্রদর্শনের সুযোগ পেত, তাহলে হয়তো অনিক দত্তকে এই আক্ষেপ বুকে নিয়ে পৃথিবী ছাড়তে হতো না।
আরও পড়ুনঃ ‘এবার সজল ঘোষের পুজোয় ঢাকেই বেশি মাইলেজ, খোঁজ নিন সুযোগ পাওয়া যাবে কিনা’ ‘ক্ষমতার পায়ের তলায় থাকতেন, এখন চুপ থাকুন!’ টলিপাড়ার সেই পরিচিত মুখকে এবার একহাত নিলেন সুদীপা!
জিতু কমলের বক্তব্যে উঠে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তাঁর মতে, কোনও শিল্পী বা স্রষ্টাকে মৃত্যুর পর নয়, জীবিত অবস্থাতেই প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কারণ একজন মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল নিজের কাজের স্বীকৃতি নিজের চোখে দেখে যাওয়া। অনিক দত্তের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ আর তৈরি হল না। তবু তাঁর সৃষ্টি আজ নন্দনের পর্দায় স্থান পেয়েছে, দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছে এবং নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকের মতে, এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শন নয়, বরং এক নির্মাতার দীর্ঘ লড়াইয়ের নীরব জয়। আর সেই জয়ের মুহূর্তেই অনুপস্থিত থেকেও যেন সবচেয়ে বেশি উপস্থিত ছিলেন অনিক দত্ত।






