“ঋতুর মতো সাহসী পুরুষ খুব কম দেখেছি….সমাজ কী বলবে, তা ওর কাছে কোনওদিন গুরুত্ব পায়নি” ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবনের কোন অজানা সাহসের অধ্যায় প্রকাশ্যে আনলেন কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের কাজ সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সেই তালিকার একেবারে প্রথম সারিতেই রয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। পরিচালক, অভিনেতা, লেখক, গীতিকার এবং সম্পাদক প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন অনন্য। সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজের অলিখিত নিয়মকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন তিনি। তাঁর সিনেমা শুধু দর্শকদের বিনোদন দেয়নি, বরং ভাবতে শিখিয়েছে। তাই মৃত্যুর এক দশকেরও বেশি সময় পরেও ঋতুপর্ণ ঘোষকে নিয়ে আলোচনা থেমে নেই।

১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। সাউথ পয়েন্ট স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হন। কর্মজীবনের শুরু বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে হলেও খুব দ্রুতই চলচ্চিত্র পরিচালনার জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। ‘হীরের আংটি’ দিয়ে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশের পর ‘উনিশে এপ্রিল’, ‘দহন’, ‘চোখের বালি’, ‘রেইনকোট’, ‘আবহমান’, ‘নৌকাডুবি’ এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’-র মতো একাধিক স্মরণীয় ছবি উপহার দেন। জীবদ্দশায় তিনি ১৯টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। একই সঙ্গে নিজের কুইয়ার পরিচয় এবং লিঙ্গ পরিচয়ের প্রকাশ নিয়ে যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তা ভারতীয় সমাজে এক নতুন আলোচনার সূচনা করেছিল।

সম্প্রতি ঋতুপর্ণ ঘোষকে স্মরণ করতে গিয়ে অভিনেতা কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ঋতুপর্ণের শিক্ষা, জ্ঞান, প্রতিভা এবং সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা তাঁর নেই বলেই তিনি মনে করেন। কৌশিকের কথায়, এত বড় মাপের একজন মানুষ হয়েও ঋতুপর্ণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধারণভাবে সবার সঙ্গে কথা বলতেন এবং সকলকে নিজের মানুষ করে নেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। অনেকেই তাঁর সম্বোধনের ধরন নিয়ে মন্তব্য করলেও কৌশিক কখনও সেটিকে নেতিবাচকভাবে দেখেননি।

সবচেয়ে বেশি যেটি তাঁকে মুগ্ধ করেছে, তা হলো ঋতুপর্ণ ঘোষের অসাধারণ সাহস। কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, নিজের জীবনের পরিবর্তন এবং লিঙ্গ পরিচয়কে যেভাবে তিনি প্রকাশ্যে গ্রহণ করেছিলেন, সেই সাহস খুব কম মানুষের মধ্যে দেখা যায়। সমাজ কী বলবে, কে কী ভাববে এসব নিয়ে ঋতুপর্ণ কোনও আপস করেননি। তিনি নিজের বিশ্বাসকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করেছেন। কৌশিকের ভাষায়, এমন সাহসী মানুষ খুব কমই দেখা যায়, কারণ অধিকাংশ মানুষ সমাজের ভয়েই নিজের ইচ্ছাকে চাপা দিয়ে রাখেন।

আরও পড়ুনঃ “আমার স্বামী প্রত্যেকটা নারীকে খুব শ্রদ্ধা করে, মনে করে নারীরা এই পৃথিবীর সবথেকে শ্রেষ্ঠ ক্রিয়েশন…কারণ তারা সৃষ্টি করতে পারে” রাজ চক্রবর্তীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ শুভশ্রী! ‘প্রথম স্ত্রী শতাব্দী কি নারী ছিলেন না?’ ‘পায়েল, মিমি যতই বলব কম… এতই শ্রদ্ধা যখন, তাহলে এতগুলো মেয়ের জীবন নষ্ট করল কেন?’ নেটিজেনদের প্রশ্নবাণে বি’দ্ধ অভিনেত্রী;

কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য আবারও মনে করিয়ে দেয়, ঋতুপর্ণ ঘোষ শুধু একজন সফল চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সামাজিক সাহস এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তাঁর সিনেমা যেমন বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনই তাঁর জীবন বহু মানুষকে নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব করতে শিখিয়েছে। তাই আজও তাঁর কাজ, তাঁর চিন্তাভাবনা এবং তাঁর জীবনদর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

You cannot copy content of this page