“ক্যা*ন্সারও আমার কণ্ঠ রোধ করতে পারেনি, গানই আমার জীবন…” তিরুপতিতে গিয়ে নিজের প্রিয় চুল দান, শরী’রে বাসা বাঁধা মা’রণ রো’গকে হার মানিয়ে আজও সুরের সাধনায় ডুবে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী স্বাগতালক্ষ্মী দাসগুপ্ত! ১৬৬ দিন টানা গান করার রেকর্ড, গায়িকার জীবন যেন অনুপ্রেরণা! কীভাবে ভ’য়াবহ যন্ত্র’ণা ভুলে এখনও গানকেই জীবনের শেষ অবলম্বন করে এগিয়ে চলেছেন তিনি?

জীবন যখন কঠিন এক লড়াইয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন কেউ কেউ হার মানেন, আবার কেউ নিজের প্রিয় কাজকেই আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেন। সুরের সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই, সেই গানই আজ তাঁর কাছে জীবনের অন্যতম বড় অবলম্বন। শরীরে মার’ণ রো’গ বাসা বাঁধলেও থেমে যায়নি তাঁর কণ্ঠ। যন্ত্রণা, চিকিৎসা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও গান রেকর্ড করে চলেছেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী স্বাগতালক্ষ্মী দাসগুপ্ত (Swagatalakshmi Dasgupta)। তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবন যেমন সাফল্যে ভরা, তেমনই সাম্প্রতিক সময়ের লড়াইও কম অনুপ্রেরণার নয়।

কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম স্বাগতার। তাঁর বাবা পবিত্র দাসগুপ্ত লন্ডনের মেরিস মিউজিক কলেজের লেকচারার ছিলেন এবং মা সুব্রতা দাসগুপ্ত ছিলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্রী। ফলে ছোট থেকেই বাড়িতে সংগীতচর্চার পরিবেশ পেয়েছেন স্বাগতা। বাবার কাছে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেওয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে এমএ করেন তিনি। পরবর্তীতে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মায়া সেনের কাছেও দীর্ঘদিন গান শেখেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর লেকচারার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। গানের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে খুব বেশি সময় লাগেনি তাঁর।

১৯৮৫ সালে অল ইন্ডিয়া সিঙ্গিং ট্যালেন্ট প্রতিযোগিতায় প্রথম হন স্বাগতা। একই বছরে আকাশবাণীর অল ইন্ডিয়া রেডিও মিউজিক কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও ভজন বিভাগেও প্রথম স্থান অর্জন করেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট মিউজিক কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও অতুলপ্রসাদী বিভাগেও সাফল্য পান তিনি। এরপর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি-সহ মোট নয়টি ভাষায় গান পরিবেশন করেছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত, হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটক শাস্ত্রীয় সংগীত, নজরুলগীতি, গজল, লোকগান ও আধুনিক বাংলা গান মিলিয়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন তিনি। ২০০৬ সালে মাত্র ১০৫ দিনে সম্পূর্ণ গীতবিতান রেকর্ড করাও তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ।

আরও পড়ুন: “শুটিং ফেলে আমার জন্য…বাড়িতে কোনও দিন তারকাসুলভ আচরণ দেখিনি, আমাদের কাছে তিনি ছিলেন শুধুই বাবা!” “ফেলুদা নিয়ে পরীক্ষা হলেও অপুকে ছোঁয়া যাবেই না, বাবার ওই চরিত্র আজও অতুলনীয়!” সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মানুষ ও অভিনেতা দুই সত্ত্বাকেই নতুনভাবে তুলে ধরলেন কন্যা পৌলমী বসু চট্টোপাধ্যায়! আবেগঘন স্মৃতিচারণে উঠে এল কোন তথ্য?

এখনও পর্যন্ত তাঁর ২২৫টির বেশি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এত সাফল্যের পরও জীবনের কঠিন পরীক্ষা আসে ২০১৯ সালের দিকে। শরীরে ধরা পড়ে ক্যা*ন্সার। শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু অসুস্থতাকে নিজের জীবনের শেষ কথা হতে দেননি স্বাগতা। বরং গানকেই আঁকড়ে ধরে কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। করো’না অতিমা’রির সময় দীর্ঘ লকডাউনের মধ্যেও টানা ১৬৬ দিন একের পর এক গান রেকর্ড করে ইউটিউবে প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাঁচার ইচ্ছেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ক্যা*ন্সার ধরা পড়ার পর তিরুপতিতে গিয়ে নিজের প্রিয় চুলও দান করেছিলেন তিনি। অনুষ্ঠান করতে গিয়ে কখনও কখনও নিজের চেহারা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপের মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার পরও কারও প্রতি ক্ষোভ পুষে রাখেননি শিল্পী।

সংগীতের পাশাপাশি লেখালেখিতেও নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন স্বাগতালক্ষ্মী দাসগুপ্ত। কবিতা ও গান নিয়ে তাঁর লেখা তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে ‘ঝাপসা হলো’, ‘তাপুর দুয়ারানের চিঠি’ এবং ‘আকাশের গান’। ভারতীয় সংগীতে অবদানের জন্য সহস্রাব্দ কালাকার পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভারত নির্মাণ পুরস্কার ও সংগীত মহাসম্মান পেয়েছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে ‘এসেছো প্রেম’ অ্যালবামের জন্য উত্তম কুমার পুরস্কার এবং ১৯৯৮ সালে সেরা মহিলা প্লেব্যাক গায়কের জন্য আনন্দলোক পুরস্কারও অর্জন করেন। তবে পুরস্কার বা খ্যাতির থেকেও আজ তাঁর লড়াইটা অন্যরকম শরীরের যন্ত্র’ণাকে পাশে সরিয়ে গানকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলা। আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তাঁর এই অধ্যবসায় নিঃসন্দেহে এক বড় বার্তা।

You cannot copy content of this page