“বাবার একটাই ভুল ছিল…” সেই অভ্যাস কি সংসারের আর্থিক ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল? মা চিত্রা সেনের মানসিক যন্ত্র’ণার কারণও ছিল সেটাই? বাবার মৃ’ত্যুতে অল্প বয়সেই, কাঁধে সংসারের দায়িত্ব! অকপট স্বীকারোক্তিতে অতীতের কঠিন দিনগুলোর কথা তুলে ধরলেন কৌশিক সেন!

বিনোদন জগতের তারকাদের জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে দেখায়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য সংগ্রাম, ত্যাগ, সাফল্য এবং ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গল্প। অনেক সময় দর্শকরা শুধুমাত্র একজন শিল্পীর সাফল্য দেখেন, কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে থাকা পারিবারিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা মানসিক চাপের কথা খুব কমই সামনে আসে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এমনই কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব কৌশিক সেন। বাবা-মা, সংসার এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে তাঁর এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি ইতিমধ্যেই চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ কৌশিক সেন। অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে স্পষ্ট মতামতের জন্যও তিনি পরিচিত। তিনি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে শিল্প ও অভিনয় ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর বাবা শ্যামল সেন এবং মা চিত্রা সেন দুজনেই বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতের সম্মানিত শিল্পী। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের পরিবেশে বেড়ে ওঠা কৌশিক আজ নিজের দক্ষতায় বাংলা বিনোদন জগতে একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কৌশিক সেন তাঁর বাবা শ্যামল সেন সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে জানান, বাবার প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে তাঁর আক্ষেপ ছিল। অভিনেতার কথায়, তাঁর বাবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মদ্যপান। তবে এই অভ্যাসের জন্য তিনি কখনও বাবাকে ঘৃণা করেননি বা বিচারও করেননি। কৌশিকের মতে, একজন মানুষ হিসেবে তাঁর বাবা অত্যন্ত সৎ ও প্রতিভাবান ছিলেন। কিন্তু মদ্যপানের অভ্যাস সংসারের আর্থিক অবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। শুধু তাই নয়, এর প্রভাব পড়েছিল তাঁর মা চিত্রা সেনের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও।

অভিনেতা আরও জানান, সেই সময় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বর্তমানের মতো ছিল না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টিও সাধারণ মানুষের কাছে এতটা সহজলভ্য ছিল না। ফলে তাঁর মায়ের মানসিক সমস্যাগুলি সঠিকভাবে চিকিৎসার সুযোগ পায়নি। তবে এত কিছুর পরেও তাঁর বাবা-মায়ের সম্পর্কের মধ্যে কোনও বড় ভাঙন বা তিক্ততা দেখা যায়নি। চিত্রা সেন শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর স্বামীর প্রতি সম্মান বজায় রেখেছিলেন। কৌশিকও বলেন, তাঁদের পরিবার কখনও বাবাকে শুধুমাত্র তাঁর দুর্বলতার জন্য বিচার করেনি। বরং তাঁরা মানুষটিকে তাঁর গুণ ও সীমাবদ্ধতা দুই দিক থেকেই দেখার চেষ্টা করেছেন।

আরও পড়ুনঃ “আজ যারা রথের দড়ি টানতে যাচ্ছো…” অভিনয়ের টানে দুর্গাপুর ছেড়ে কলকাতায় ব্যস্ত জীবন! শুটিংয়ের চাপে বাড়ি ফেরা হয় না, ‘পরিণীতা’র পারুলের! ছোটবেলার রথযাত্রার স্মৃতি ভাগ করতে গিয়ে আবেগে ভাসলেন ঈশানী! রথের দিনে কী কী করতেন জানালেন অভিনেত্রী?

বাবার মৃত্যুর পর সংসারের অনেক দায়িত্ব এসে পড়ে কৌশিক সেনের কাঁধে। আর্থিক অনিশ্চয়তা সামলানোর পাশাপাশি তাঁকে পরিবার, পেশা এবং সন্তানের ভবিষ্যতের দায়িত্বও একসঙ্গে বহন করতে হয়েছে। সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে অভিনেতা জানান, তিনি জীবনের সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বড় শিক্ষা পেয়েছেন। তাই আজ তিনি সবসময় চেষ্টা করেন, কোনও পরিস্থিতিতেই যেন তাঁর সন্তানের উপর অকাল দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিতে না হয়। বাবার প্রতি তাঁর কিছু অভিযোগ থাকলেও, সেই অভিযোগের আড়ালেই রয়েছে গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে পাওয়া শিক্ষা। কৌশিক সেনের এই অকপট স্বীকারোক্তি শুধু একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত গল্প নয়, বরং বহু মধ্যবিত্ত পরিবারের অদেখা সংগ্রামের প্রতিচ্ছবিও বটে।

You cannot copy content of this page