বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে একটুও ম্লান হয়নি। সেই তালিকায় সবার উপরে থাকা নামগুলির অন্যতম মহানায়ক উত্তম কুমার। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দায় তাঁর উপস্থিতি তাঁকে বাঙালির কাছে চিরকালীন করে তুলেছে। একটা সময় তাঁর অভিনয় এবং স্টাইল ছিল বাঙালি পুরুষদের কাছে অনুপ্রেরণার বিষয়, আবার তাঁর রূপ ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলেন অসংখ্য মহিলা। আজও উত্তম কুমারের সিনেমা, গান এবং অভিনয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই বাঙালির মনে আলাদা আবেগ তৈরি হয়। তবে পর্দায় যতটা উজ্জ্বল ছিল তাঁর জীবন, ব্যক্তিগত জীবনে ততটাই ছিল নানা টানাপোড়েন। বিশেষ করে স্ত্রী গৌরী দেবীর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল নানা ওঠাপড়ায় ভরা।
১৯৪৮ সালের ১ জুন গৌরী দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন উত্তম কুমার। তাঁদের একমাত্র সন্তান গৌতম। উত্তমের অভিনয় জীবনের শুরুর দিকটা মোটেই সহজ ছিল না। সেই কঠিন সময়ে স্ত্রী গৌরী দেবী তাঁর পাশে ছিলেন এবং সংসারের দায়িত্ব সামলেছিলেন। পরবর্তীকালে উত্তম কুমারের অভিনয় জীবন যখন সাফল্যের শিখরে পৌঁছয়, তখন কাজের ব্যস্ততা এবং জনপ্রিয়তার কারণে তাঁদের সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। পরবর্তীতে অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে উত্তম কুমারের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা হয়। বিষয়টি গৌরী দেবীর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হলেও, তাঁদের আইনগত বিচ্ছেদ হয়নি। গৌরী দেবী তাঁর ঘরণীর পরিচয়েই থেকে যান এবং নিজের মতো করে সংসার সামলে যান।
কিন্তু ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমারের আকস্মিক মৃত্যু সবকিছু যেন ওলটপালট করে দেয়। মহানায়কের মৃত্যুর পর গৌরী দেবী মানসিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর নাতনি নবমিতা। উত্তম কুমারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নবমিতা তাঁর ঠাকুমার সেই কঠিন সময়ের কথা তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, স্বামীকে হারানোর শোক গৌরী দেবী কোনওভাবেই মেনে নিতে পারেননি। উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কাঁদতেন এবং স্বামীর মৃত্যুর বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল। সেই সময় তাঁর মানসিক অবস্থাও ভালো ছিল না বলে জানিয়েছেন নবমিতা।
উত্তম কুমারের দেওয়া জিনিসপত্রের সঙ্গেও যেন তাঁর স্মৃতির গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল গৌরী দেবীর। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর সেই স্মৃতিই তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। নবমিতার বক্তব্য অনুযায়ী, গৌরী দেবী তাঁদের বাড়ির বারান্দা থেকে একে একে উত্তম কুমারের দেওয়া শাড়ি, বেনারসি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে দিতেন। এমনকী সোনার গয়নাও তিনি ফেলে দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর নাতনি। সধবা নারীর সঙ্গে লাল রঙের যে প্রচলিত সম্পর্ক, সেটিও তিনি যেন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। লাল রঙের পোশাক এড়িয়ে চলতেন তিনি। সোনার কাজ করা বেনারসি শাড়িও তাঁর কাছে আর গ্রহণযোগ্য ছিল না। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত জিনিসপত্র এভাবে ফেলে দেওয়ার ঘটনা তাঁর গভীর মানসিক যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ ছিল বলে মনে করা হয়।
আরও পড়ুন: “ওর সমর্থ ছেলে মা’রা গেছে, তাই কোমর ভে’ঙে গেছে, আঁচল খসে গেছে…” মায়ের এই একটি উক্তি কীভাবে বিশ্বনাথ বসুর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠেছিল? আজও কেন সেই স্মৃতি ভুলতে পারেন না তিনি? বহু বছর পর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অমূল্য শিক্ষা ও হৃদয়ছোঁয়া জীবনদর্শনের কথা ভাগ করে নিলেন অভিনেতা!
নবমিতার কথায়, উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর গৌরী দেবীর জীবন কার্যত বদলে যায়। ঘুমের ওষুধ খেয়েও যখন ঘুম আসত না, তখন তিনি মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন বলেও সাক্ষাৎকারে দাবি করা হয়েছে। এমনকি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছাও তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন নবমিতা। উত্তম কুমারের মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই, ১৯৮১ সালের ২১ এপ্রিল গৌরী দেবীরও মৃত্যু হয়। মহানায়কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের যে দীর্ঘ অধ্যায় শুরু হয়েছিল ভালোবাসা, সংসার এবং নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে, তার শেষটা হয়েছিল গভীর শোকের মধ্যে দিয়ে। উত্তম কুমার আজও বাঙালির হৃদয়ে অমর হলেও, তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী গৌরী দেবীর জীবনে নেমে আসা সেই অন্ধকার অধ্যায় তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের এক বেদনাদায়ক দিক হিসেবেই রয়ে গিয়েছে।






