বাংলা গানের জগতে কবীর সুমন এক স্বতন্ত্র নাম। গান লেখার ধরন, সুরের ব্যবহার এবং সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য তাঁকে বরাবরই অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। একসময় তিনি পরিচিত ছিলেন সুমন চট্টোপাধ্যায় নামে। ‘তোমাকে চাই’-এর মতো গান তাঁকে বাংলা আধুনিক গানের জগতে নতুন পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীতে নিজের নাম বদলে তিনি হয়ে ওঠেন কবীর সুমন। শুধু নামের পরিবর্তন নয়, তাঁর জীবনে আসে ধর্মীয় পরিচয়েরও পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনকে ঘিরেই তাঁকে নানা সময়ে সামাজিক কটাক্ষ, ট্রোলিং এবং নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সুমন চট্টোপাধ্যায় থেকে কবীর সুমন হওয়ার বিষয়টি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, ‘কবীর’ নামটি নেওয়ার পিছনে রয়েছে বাঙালি মুসলিম কবি শেখ কবীরের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা। নিজের মূল নাম ‘সুমন’ রেখে তার সঙ্গে ‘কবীর’ যুক্ত করেন তিনি। অর্থাৎ তাঁর নাম হয়ে ওঠে কবীর সুমন। তবে এই নাম পরিবর্তনের সঙ্গে শুধু পরিচয়ের বদলই ছিল না, তিনি সচেতনভাবে ইসলাম ধর্মও গ্রহণ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত তিনি নিজে থেকেই নিয়েছিলেন এবং এর পিছনে ছিল একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও মানবিক ভাবনা।
কবীর সুমন বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, সমাজে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া নেতিবাচক মনোভাব, অন্যায় এবং সংকট তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের যন্ত্রণা ও ভাগ্যের শরিক হওয়ার ইচ্ছা থেকেই তিনি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে ধর্ম পরিবর্তনকে কোনও ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। তাই সুমন চট্টোপাধ্যায় থেকে কবীর সুমন হয়ে ওঠার ঘটনাকে তিনি নিজের বিশ্বাস, অবস্থান এবং সামাজিক সংহতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তাঁর ধর্ম পরিবর্তন নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হল বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনকে বিয়ে করার কারণেই কি তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন? কবীর সুমন সেই ধারণা অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ের কারণে তিনি ধর্ম পরিবর্তন করেননি এবং তাঁর স্ত্রীও তাঁকে কখনও ধর্ম বদলাতে বলেননি। বরং ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের। একই সঙ্গে নিজের নামের ‘কবীর’ অংশের উৎস হিসেবেও তিনি শেখ কবীরের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি নিজের সামাজিক অবস্থান এবং মুসলিম সমাজের প্রতি সংহতির ভাবনাও তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
আরও পড়ুনঃ একই দিনে জন্ম, সম্পর্কও যেন মা-মেয়ের! ছোট্ট চুমকিকে মেয়ের মতো আগলে রাখতেন লিলি, আউটডোরে শাসন থেকে মেকআপ রুমে তাস খেলা, পুরনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে আবেগপ্রবণ দেবশ্রী, ‘লিলিমাসি’র স্নেহে আজও ভাসেন তিনি? জন্মদিনে একে অপরের জীবনের অজানা অধ্যায় ভাগ করলেন দুই প্রজন্মের অভিনেত্রী?
তবে ধর্মীয় পরিচয় বদলের পর কবীর সুমনের অভিজ্ঞতা সবসময় সহজ ছিল না। তিনি জানিয়েছেন, সুমন চট্টোপাধ্যায় হিসেবে যখন তিনি ‘আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু’ গানটি গেয়েছিলেন, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেননি যে একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ হয়ে তিনি কেন এমন গান গাইছেন। কিন্তু পরবর্তীতে কবীর সুমন হিসেবে পরিচিত হওয়ার পর একই ধরনের গান গাওয়াতেই তাঁকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় ‘আপনি মুসলমান হয়ে কেন এই গান গাইছেন?’ অর্থাৎ তাঁর মতে, নাম ও ধর্মীয় পরিচয় বদলে যাওয়ার পরই তাঁকে শিল্পী হিসেবে নয়, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা শুরু হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সমাজের ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং মানুষের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, একজন শিল্পীর গান বা বক্তব্যকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে বিচার না করে তার মানবিক বার্তাটাকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।






