বিনোদন জগতে প্রতিদিন অসংখ্য শিল্পীর আগমন ঘটে, আবার সময়ের স্রোতে অনেকেই হারিয়েও যান। কিন্তু কিছু চরিত্র এমন থাকে, যাদের উপস্থিতি কয়েক মিনিটের হলেও তারা চিরকালের জন্য জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ে। সিনেমার পর্দা পেরিয়ে সেই চরিত্র যেন ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ঠিক তেমনই এক চরিত্র ‘ইন্দির ঠাকরুন’। পথের পাঁচালী ছবিতে তাঁর ক্লান্ত মুখ, কাঁপা গলা আর অসহায় হাসি আজও বাঙালির আবেগের অংশ। আর সেই চরিত্রকে অমর করে রেখেছিলেন অভিনেত্রী চুনিবালা দেবী(Chunibala Devi)।
১৮৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন চুনিবালা দেবী। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে বড় হওয়া এই মহিলার কাছে অভিনয় ছিল প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন। তখনকার সমাজে অভিনেত্রীদের খুব একটা সম্মানের চোখে দেখা হত না। তবুও অভিনয়ের প্রতি অদ্ভুত টান ছিল তাঁর। ১৯৩০ সালে প্রথমবার ‘বিগ্রহ’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর ১৯৩২ সালে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচালনায় ‘নটীর পূজা’ নাটকে অভিনয় করেন। পরে ‘রিক্তা’ নামের আরও একটি ছবিতে কাজ করলেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যান ইন্ডাস্ট্রি থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভুলতে বসেছিল সবাই তাঁকে। শেষ জীবনে কলকাতার নিষিদ্ধ পল্লির এক কোণে প্রায় অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটছিল বৃদ্ধা চুনিবালার। কেউ জানত না, তাঁর জীবনে এখনও বাকি রয়েছে এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়।
সেই সময়েই বাংলা সিনেমায় নতুন স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে তিনি তৈরি করতে চলেছেন ‘পথের পাঁচালী’। ছবির জন্য দরকার ছিল এক বৃদ্ধা অভিনেত্রী, যিনি ইন্দির ঠাকরুন চরিত্রটিকে বাস্তব করে তুলতে পারবেন। বহু খোঁজাখুঁজির পর সত্যজিৎ রায় পৌঁছে যান চুনিবালা দেবীর কাছে। তখন তাঁর বয়স প্রায় ৮০। দীর্ঘদিন অভিনয় জগতের বাইরে থাকা বৃদ্ধা প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন এই প্রস্তাব শুনে। পরে আনন্দে নিজের পুরনো সিনেমার পোস্টার দেখাতে শুরু করেছিলেন পরিচালককে। ঠিক হয়, প্রতিদিন ২০ টাকা পারিশ্রমিক পাবেন তিনি। শ্যুটিং চলাকালীন অসুস্থ শরীর নিয়েও যে নিষ্ঠা আর একাগ্রতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা মুগ্ধ করেছিল গোটা ইউনিটকে। ‘হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যে হল’ গান গাওয়ার পর মৃত্যুর দৃশ্য আজও বাংলা সিনেমার অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে মনে রাখা হয়। সেই দৃশ্যে নিজের জীবনের সমস্ত কষ্ট যেন ঢেলে দিয়েছিলেন চুনিবালা দেবী।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জীবিত অবস্থায় প্রাপ্য সম্মান খুব কমই পেয়েছিলেন তিনি। ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির আগেই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান চুনিবালা দেবী। সেই সময় ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রায় মহামারীর আকার নিয়েছিল। দীর্ঘ সংগ্রামের জীবনে যিনি কখনও বড় স্বীকৃতি পাননি, তিনি মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে নিউ ইয়র্কে ছবিটি প্রদর্শিত হওয়ার পর বিদেশি দর্শকরাও মুগ্ধ হন তাঁর অভিনয়ে। পরে ম্যানিলা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পান তিনি। প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্মান পেলেও, সেই আনন্দ নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি চুনিবালা দেবী। জীবনভর অবহেলা, দারিদ্র্য আর একাকীত্ব নিয়েই কাটাতে হয়েছিল তাঁকে।
আরও পড়ুনঃ “সততা আর একাগ্রতা যদি না থাকে, তাহলে কী হবে তোদের এখানে এসে?” “কে মাথার দিব্যি দিয়ে আসতে বলেছে?” নিষ্ঠাহীনতা দেখে রীতিমতো ক্ষুব্ধ, বর্তমান প্রজন্মকে কঠিন প্রশ্নে কোণঠাসা করলেন শুভাশিষ মুখোপাধ্যায়!
আজও ‘পথের পাঁচালী’র কথা মনে পড়লে সেই বৃদ্ধা অভিনেত্রীকে মনে পড়ে, যিনি জীবনের শেষ বেলায় আলোয় ফিরেছিলেন, কিন্তু সেই আলোয় বাঁচার সুযোগ আর পাননি। তাঁর অভিনয় আজও প্রমাণ করে, প্রকৃত শিল্প কখনও মরে না। সময় পেরিয়ে গেলেও কিছু মুখ, কিছু সংলাপ, কিছু অনুভূতি চিরকাল মানুষের মনে থেকে যায়। চুনিবালা দেবীর জীবন যেন সেই বাস্তব উদাহরণ যেখানে এক শিল্পী বেঁচে থাকতে পাননি প্রাপ্য সম্মান, অথচ মৃত্যুর পরে হয়ে উঠেছেন বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।






