ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে এমন কিছু শিল্পীর নাম রয়েছে, যাঁরা শুধু নিজেদের প্রতিভা দিয়েই নয়, নিষ্ঠা ও দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে একটি বিশেষ উচ্চতা অর্জন করেছেন। সেই তালিকার অন্যতম উজ্জ্বল নাম কৌশিকী চক্রবর্তী। বর্তমানে সংগীতপ্রেমীদের কাছে তিনি যেমন একজন প্রতিষ্ঠিত ক্লাসিক্যাল গায়িকা, তেমনই জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়্যালিটি শো ‘সারেগামাপা’-র বিচারক হিসেবেও পরিচিত মুখ। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য, গানের গভীরতা এবং মঞ্চে আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। তবে এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে বহু বছরের অধ্যবসায়, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সংগীতের প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা।
১৯৮০ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার এক বিশিষ্ট সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কৌশিকী। তাঁর বাবা পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় শিল্পী এবং মা চন্দনা চক্রবর্তীও সুপরিচিত গায়িকা। ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীত ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাড়ির পরিবেশেই প্রথম গানের হাতেখড়ি হয়। অল্প বয়স থেকেই তিনি নিয়মিত রেওয়াজ করতেন এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। মাত্র দশ বছর বয়সে গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করেন। এরপর সংগীত শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে তিনি আইটিসি সংগীত গবেষণা একাডেমিতে ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজের শিল্পীসত্তাকে আরও পরিণত করে তোলেন।
আইটিসি সংগীত গবেষণা একাডেমিতে পড়াশোনার সময় কৌশিকী শুধু বাবার কাছ থেকেই নয়, প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন পরিচালক ও বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞদের তত্ত্বাবধানেও শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম দিকগুলি রপ্ত করেন। বিশেষ করে খেয়াল গায়নে তাঁর দক্ষতা দ্রুত নজর কাড়ে সংগীত মহলের। পরবর্তীকালে তিনি কিংবদন্তি শিল্পী বালমুরলী কৃষ্ণের কাছ থেকেও দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন। ফলে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি কর্ণাটক সংগীতের ধারাও তাঁর শিল্পীজীবনকে সমৃদ্ধ করে। খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, ভজন কিংবা আধুনিক ধারার উপস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ তাঁকে বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। সংগীতের পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেও তিনি যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন এবং দুই ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

মঞ্চে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন কৌশিকী চক্রবর্তী। বাংলা সিনেমার একাধিক উল্লেখযোগ্য ছবিতে তাঁর কণ্ঠ শোনা গিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের গানে সাবলীলভাবে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে সংগীত পরিচালকদের কাছেও বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। একইসঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতেও তাঁর গভীর অনুরাগ এবং দক্ষতা শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে বারবার। সংগীতচর্চার পাশাপাশি টেলিভিশনের জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতার বিচারকের আসনেও তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া এবং সংগীত সম্পর্কে মূল্যবান পরামর্শ দেওয়ার জন্যও তিনি প্রশংসিত।
আরও পড়ুনঃ “তখন আমার বয়স মাত্র এক বছর…” “মা কাঁদত আর আমি দেখতাম, এবার মা শুধুই হাসুক আমি চাই!” কোলের শিশু ও স্ত্রীকে রেখে চলে যান স্বামী! একলা মায়ের সংগ্রামের নীরব সাক্ষী মেয়ে, শেষ করে দিতে চেয়েছিল নিজেকে! জীবনের অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ্যে আনলেন অভিনেত্রী মেঘনা হালদার, মেঘনা-অক্ষরার লড়াই ছুঁয়ে যাবে হৃদয়!
পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও কৌশিকী চক্রবর্তী এক সুখী পরিবারের সদস্য। ২০০৪ সালের ৯ জুলাই দীর্ঘদিনের বন্ধু ও বিশিষ্ট ক্লাসিক্যাল শিল্পী পার্থসারথী দেশিকানকে বিয়ে করেন তিনি। সংগীতই তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম বড় বন্ধন। কৌশিকীর শিল্পীজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বামীর সহযোগিতা ও সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে ঘনিষ্ঠ মহলের মত। তাঁদের একমাত্র পুত্র ঋষিও ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বড় হয়ে উঠছে। পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রেখে সেও সংগীত শিক্ষা নিচ্ছে এবং ইতিমধ্যেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মায়ের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংগীতকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে এগিয়ে চলা এই পরিবার আজও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।






